রাজশাহীতে ৬৯ সার ডিলার নিয়োগে নজিরবিহীন স্বজনপ্রীতি ও দলীয়করণের অভিযোগ: তালিকার প্রায় শতভাগই বিএনপি পরিবারের

0
রাজশাহীতে ৬৯ সার ডিলার নিয়োগে নজিরবিহীন স্বজনপ্রীতি ও দলীয়করণের অভিযোগ: তালিকার প্রায় শতভাগই বিএনপি পরিবারের

মাসুদ রানা রাব্বানীঃ রাজশাহী জেলায় নতুন সার ডিলার নিয়োগকে কেন্দ্র করে ব্যাপক জালিয়াতি, শতভাগ রাজনৈতিক স্বজনপ্রীতি ও দলীয়করণের চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে। জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সুপারিশে রাজশাহী জেলার ১টি সিটি কর্পোরেশন, ৭২টি ইউনিয়ন ও ১৪টি পৌরসভার জন্য চূড়ান্তকৃত তালিকায় ৬৯ জন নতুন ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তবে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, লটারি বা মেধার তোয়াক্কা না করে নিয়োগপ্রাপ্ত প্রায় সকলেই স্থানীয় বিএনপি ও তার অঙ্গ-সংগঠনের প্রভাবশালী নেতা, তাদের স্ত্রী, সন্তান বা আত্মীয়স্বজন। বিশাল এই তালিকায় নামমাত্র কেবল ১ জন জামায়াত কর্মীর ঠাঁই মিলেছে।

অন্যদিকে, পছন্দসই দলীয় ব্যক্তিদের নাম না থাকায় এবং কোন্দলের কারণে বাগমারা উপজেলার ১৮টি পদের নিয়োগ আপাতত স্থগিত রয়েছে। অভিজ্ঞ ও প্রকৃত ব্যবসায়ীদের বাদ দিয়ে রাজনীতিভিত্তিক এই নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে পুরো জেলায় চরম ক্ষোভ ও সমালোচনার ঝড় বইছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত ২১ সেপ্টেম্বর রাজশাহী জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে অতি গোপনে আয়োজিত এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে এই বিতর্কিত তালিকা চূড়ান্ত করা হয়। বৈঠকে জেলা প্রশাসক, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক এবং জেলার ৩ জন সংসদ সদস্যসহ মাত্র পাঁচজন উপস্থিত ছিলেন।

জেলা প্রশাসনের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা জানান, প্রচুর আবেদনকারীর মধ্য থেকে নিয়ম রক্ষার্থে প্রতি পদের জন্য তিনটি করে নাম মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছিল। তবে যাকে নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত আগে থেকেই ঠিক করা ছিল, তার নাম রাখা হয় ১ নম্বর ক্রমিকে। অন্য দুটি নাম ছিল স্রেফ লোকদেখানো বা ‘আইওয়াশ’। আবেদনকারীরা শুরু থেকেই স্বচ্ছতার জন্য লটারির মাধ্যমে ডিলার নির্বাচনের দাবি জানালেও রাজনৈতিক চাপে তা করা সম্ভব হয়নি। এর ফলে ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও কেবল দলীয় পরিচয়ে ডিলারশিপ পেয়ে গেছেন অনেকে।

চারঘাট সদর ইউনিয়নে ডিলারশিপ পেয়েছে উপজেলা যুবদলের আহ্বায়কের স্ত্রী জিনিয়া পারভিনের ‘আলিফ ট্রেডার্স’। সরদহ ইউনিয়নে উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতির স্ত্রী ইসরাত জাহানের ‘অথৈয় অ্যান্ড আরিয়া ট্রেডার্স’, নিমপাড়া ইউনিয়নে ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম এবং ইউসুফপুর ইউনিয়নে সাবেক ইউপি চেয়ারম্যানের স্ত্রী সুরভি আক্তার শিখা ডিলারশিপ পেয়েছেন।

মনিগ্রামে জেলা বিপ্লবী দলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক রুবেল আলী, পাকুড়িয়ায় ইউনিয়ন বিএনপির সিনিয়র সদস্য জিয়ারুল, বাউসায় সাবেক ইউনিয়ন বিএনপি সভাপতির স্ত্রী জোবাইদা খাতুন, গড়গড়িতে ইউনিয়ন যুবদলের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মমিন, আড়ানী পৌরসভায় ১ নং ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি এবং বাঘা পৌরসভায় উপজেলা জিয়া পরিষদের সিনিয়র সহ-সভাপতি ডিলার হিসেবে মনোনীত হয়েছেন।

তানোর পৌরসভায় পৌর যুবদলের আহ্বায়ক এমদাদুল হক মণ্ডল, মুন্ডুমালা পৌরসভায় পৌর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদকের ভাই ফরহাদ কবির, কলমা ইউনিয়নে জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতির ছেলে তানভীর আহমেদ এবং পাঁচন্দর ইউনিয়নে উপজেলা যুবদলের আহ্বায়কের স্ত্রী উম্মুল মোমেনিন খান নিয়োগ পেয়েছেন। এছাড়া সরনজাই, চাঁন্দুড়িয়া, বাধাইড়, কামারগাঁও ও তালন্দ ইউনিয়নে যথাক্রমে স্থানীয় বিএনপি সভাপতি, ওয়ার্ড বিএনপি সভাপতি, যুবদল নেতার স্ত্রী, যুবদলের সদস্য সচিব এবং উপজেলা বিএনপির আহ্বায়কের স্বজনরা ডিলারশিপ পেয়েছেন।

বেলপুকুরে ইউনিয়ন ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি, শিলমাড়িয়া ও পুঠিয়া সদরে বিএনপি নেতা, জিউপাড়ায় কৃষকদলের সদস্য সচিব, বানেশ্বরে স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সদস্য সচিব এবং পুঠিয়া পৌরসভায় স্থানীয় সংসদ সদস্যের নাতিজামাই সাহেদ হাসানকে ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

মোহনপুরের ঘাসিগ্রাম, পবার পারিলা ও হরিয়ান, দুর্গাপুরের ঝালুকায় ইউনিয়ন ও উপজেলা বিএনপি নেতাদের ছেলেরা ডিলারশিপ পেয়েছেন। গোদাগাড়ীর বাসুদেবপুর, কাকনহাট, গোদাগাড়ী ইউনিয়ন ও রিশিকুলে যুবদল ও ছাত্রদলের নেতারা ডিলার হয়েছেন। গোদাগাড়ী পৌরসভায় নিয়োগপ্রাপ্ত একমাত্র ডিলারকে স্থানীয়রা জামায়াত কর্মী হিসেবে শনাক্ত করেছেন।

তালিকা তৈরি নিয়ে চরম কোন্দলের জেরে বাগমারার ১৬টি ইউনিয়ন ও ২টি পৌরসভার সার ডিলার নিয়োগ আটকে গেছে। রাজশাহী-৪ (বাগমারা) আসনের সংসদ সদস্য ও কৃষি মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটির সদস্য আব্দুল বারী অভিযোগ তুলেছেন, তার এলাকার জন্য সুপারিশকৃত তালিকায় দলীয় পছন্দ প্রতিফলিত হয়নি। তিনি ডিলার নিয়োগ বন্ধ রাখতে কৃষি সচিব ও মহাপরিচালককে চিঠি দিলে মন্ত্রণালয় বাগমারার অংশটি স্থগিত রাখতে বাধ্য হয়।

সার ডিলার নিয়োগে দলীয়করণের অভিযোগ প্রসঙ্গে জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সদস্য সচিব ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোস্তফা কামাল হোসেন জানান, “আমরা কেবল কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করে সুপারিশ পাঠিয়েছি। কে কোন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জড়িত, তা জানার সুযোগ আমাদের নেই।”

অন্যদিকে, চারঘাট-বাঘা আসনের সংসদ সদস্য আবু সাঈদ চাঁদ দলীয় তালিকার বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, “আমরা প্রশাসনের কাছে কোনো তালিকা দেইনি। প্রশাসন সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে যাচাই-বাছাই করে উপযুক্ত ব্যক্তিদেরই নিয়োগ দিয়েছে।”

ব্যাপক বিতর্ক ও সমালোচনার বিষয়ে বক্তব্য জানতে জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতি ও রাজশাহী জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলামের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।