অর্থনৈতিক প্রতিবেদকঃ বিজ্ঞপ্তি নেই, প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষাও নেই—তবুও মেলে ইসলামী ব্যাংকের উচ্চপদ থেকে শুরু করে কর্মকর্তা-কর্মচারীর চাকরি। পাসপোর্ট কিংবা যোগ্যতা নয়, নিয়োগের মূল চাবিকাঠি ছিল নির্দিষ্ট এক অঞ্চলের বাসিন্দা হওয়া এবং চেয়ারম্যানের পটিয়ার বাড়ির নির্দিষ্ট বাক্সে জীবনবৃত্তান্ত (CV) জমা দেওয়া! ২০১৭ সালে বিতর্কিত ব্যবসায়ী গোষ্ঠী এস আলম গ্রুপ দেশের সবচেয়ে বড় শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক ইসলামী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত ঘটে যাওয়া নজিরবিহীন নিয়োগ জালিয়াতির বিস্তারিত তথ্য উঠে এসেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের এক চাঞ্চল্যকর তদন্ত প্রতিবেদনে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক আরিফুজ্জামানের নেতৃত্বে গঠিত সাত সদস্যের একটি বিশেষ পরিদর্শক দল সম্প্রতি গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমানের কাছে প্রতিবেদনটি জমা দেয়।
বাক্সে ফেলা সিভিতেই ভাগ্যের চাকা!
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত ইসলামী ব্যাংকে মোট কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা ছিল ২১,৫৫১ জন। ২০১৭ থেকে ২০২৪ সালের আগস্টের মধ্যে নতুন নিয়োগ দেওয়া হয় ১০,৮৩২ জনকে। এর মধ্যে ৮,৫৪২ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে সম্পূর্ণ পরীক্ষা ও নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই শুধু জীবনবৃত্তান্তের ভিত্তিতে চাকরি দেওয়া হয়।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, এস আলম গ্রুপের তৎকালীন চেয়ারম্যান সাইফুল আলমের পটিয়ার বাসভবন এবং চট্টগ্রামের আসাদগঞ্জ কার্যালয়ে জীবনবৃত্তান্ত জমা নেওয়ার জন্য আলাদা বাক্স রাখা হতো। যেখানে পদের পাশাপাশি আবেদনকারীর এলাকা ও লিঙ্গভিত্তিক পৃথক তালিকা হতো। দৈবচয়নের ভিত্তিতে নির্বাচন করা একাধিক কর্মকর্তার সাক্ষ্য অনুযায়ী, এসব বাক্সে সিভি জমা হওয়ার পর সেখানেই নামমাত্র মৌখিক পরীক্ষা অথবা কোনো কোনো ক্ষেত্রে কোনো পরীক্ষা ছাড়াই সরাসরি প্রধান কার্যালয় থেকে নিয়োগপত্র দেওয়া হয়।
ইসলামী ব্যাংকের সার্বিক নিয়োগপ্রক্রিয়ায় মেধার পরিবর্তে চরম আঞ্চলিকতা ও চরম একপেশে দৃষ্টিভঙ্গি অনুসরণ করা হয়েছে। মোট ৮,৫৪২ জন নিয়োগপ্রাপ্তের মধ্যে চট্টগ্রাম অঞ্চলের বাসিন্দা ৮,০৯৯ জন—যা মোট অনিয়ম নিয়োগের প্রায় ৭৫ শতাংশের বেশি। আরও অবাক করার মতো তথ্য হলো, শুধু এস আলমের নিজ উপজেলা পটিয়া থেকেই নিয়োগ পেয়েছেন ৫,১৪৮ জন।
বাকি জেলাগুলোর মধ্যে কক্সবাজার থেকে ৩৯৮, কুমিল্লা থেকে ১১৪, ময়মনসিংহ থেকে ৯৯, বগুড়া থেকে ৯৭, ঢাকা থেকে ৯৬, রাজশাহী থেকে ৮৩, যশোর থেকে ৭৮, গাইবান্ধা থেকে ৭৫ এবং রংপুর থেকে ৬৬ জন নিয়োগ পান।
ব্যাংকের ২৭টি ক্যাটাগরির পদে কোনো রকম বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই জনবল বসানো হয়েছে। ডিএমডি পদে নিয়োগে ২০ বছরের ব্যাংকিং অভিজ্ঞতা ও পূর্ববর্তী পদে অন্তত ২ বছরের অভিজ্ঞতা থাকা বাধ্যতামূলক হলেও এস আলমের পিএস আকিজ উদ্দিনকে মাত্র ৮ বছরের এবং মিফতাহ উদ্দীনকে ১৭ বছরের অভিজ্ঞতায় ডিএমডি বানানো হয়। এছাড়া সরাসরি ২ জন এমডি (MD), ৮ জন ডিএমডি (DMD), ২ জন এসইভিপি (SEVP), ৪ জন ইভিপি (EVP) এবং ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের প্রিন্সিপালকে বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়।
প্রবেশনারি অফিসারদের ২০১৯ সালের ২৪তম ব্যাচেও ছিল ব্যাপক অনিয়ম। ১৯০ জনকে বিজ্ঞপ্তি ছাড়া নেওয়া হয়, যাদের সবাই চট্টগ্রামের বাসিন্দা ছিলেন। ওই ব্যাচের লিখিত পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ৭৬৩ জনের মধ্যে মাত্র ৩৬ জন ন্যূনতম ৫০% পাস নম্বর পান। কিন্তু পরবর্তীতে সেই পাস নম্বর কমিয়ে মাত্র ২০% বানিয়ে ফেল করা প্রার্থীদের মধ্য থেকেও বাছাই করে ব্যাংকটিতে নিয়োগ প্রদান করা হয়।
২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গঠিত নতুন পরিচালনা পর্ষদ এসব ভুয়া ও অনিয়মতান্ত্রিক নিয়োগপ্রাপ্তদের মেধা ও যোগ্যতা যাচাইয়ে ‘স্পেশাল অ্যাসেসমেন্ট টেস্ট’ বা মূল্যায়ন পরীক্ষার উদ্যোগ নেয়।
পরীক্ষায় অংশ নেননি ৪,৯৭১ জন, ডাকা সত্ত্বেও সিংহভাগ কর্মী পরীক্ষায় অংশ নেননি। অংশগ্রহণকারী ৪০২ জন টিকেছেন যারা অংশ নিয়ে পাস করেছেন, তাদের চাকরিতে বহাল রাখা হয়। চাকরি খোয়ালেন ৪,৬৮৫ জন পরীক্ষা বর্জন করা ও অযোগ্য ৪,৬৮৫ কর্মীকে বরখাস্ত করে ইসলামী ব্যাংক ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ। বরখাস্তকৃতদের মধ্যে ৪,৪৪০ জনই চট্টগ্রামের বাসিন্দা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০১৭ সালে ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার বছর ৩৬৭ জন নিয়োগ পান। এর পর ২০১৮ সালে ১,১১৮ জন, ২০১৯ সালে সর্বোচ্চ ২,৪৬৭ জন, ২০২০ সালে ২,১১০ জন, ২০২১ সালে ৮৬৫ জন, ২০২২ সালে ২,১১৯ জন, ২০২৩ সালে ৩৯৭ জন এবং ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত ১,৩৯২ জন নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতে, ইসলামী ব্যাংকের নিয়োগ নীতিমালায় অন্তত দুটি জাতীয় দৈনিকে বিজ্ঞপ্তি প্রদান এবং লিখিত-মৌখিক পরীক্ষায় ন্যূনতম ৫০% নম্বর বাধ্যতামূলক ছিল। কিন্তু এস আলম জমানায় নীতিমালার তোয়াক্কা না করে ব্যাংকটিকে দলীয় ও আঞ্চলিক কার্যালয়ে পরিণত করা হয়েছিল, যার মাশুল এখন ব্যাংকটি পোহাচ্ছে।

