বাংলাদেশ প্রতিবেদক: পরিবহন খরচ বৃদ্ধি ও পাইকারি আড়তদারদের অনিয়ন্ত্রিত সিন্ডিকেটের প্রভাবে রাজধানীর কাঁচাবাজারগুলোতে সপ্তাহের ব্যবধানে আবারও হু-হু করে বাড়ছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম। কাঁচা মরিচ থেকে শুরু করে সবজি, মুরগি, ডিম ও মাছ—প্রায় প্রতিটি অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের বাজারে আগুন। তবে এই অগ্নিমূল্যের বাজারে কেবল গরুর মাংসের দামে কিছুটা হ্রাস আসায় সামান্য স্বস্তি দেখা গেছে।
রাজধানীর হাতিরপুল, কাপ্তানবাজার পলাশী ও ফকিরাপুল কাঁচাবাজারসহ বেশ কয়েকটি বাজার ঘুরে ক্রেতা ও বিক্রেতাদের সাথে কথা বলে এ চিত্র পাওয়া গেছে। এলাকা ও বাজারভেদে পণ্যের দামে কিছুটা তফাৎ দেখা গেলেও সার্বিক পরিস্থিতি সাধারণ ও সীমিত আয়ের মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে।
সবচেয়ে বেশি অস্থিরতা দেখা গেছে সবজির বাজারে। সরবরাহ ঘাটতির অজুহাতে মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে টমেটোর দাম দ্বিগুণ বেড়েছে। গত সপ্তাহে ১২০ টাকা কেজিতে বিক্রি হওয়া টমেটো এখন বিক্রি হচ্ছে ২৪০ টাকায়। অর্থাৎ কেজিতে সরাসরি বেড়েছে ১২০ টাকা।
কাঁচা মরিচের দাম কেজিপ্রতি ৪০ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ১৬০ টাকায় (গত সপ্তাহে ছিল ১২০ টাকা)। শিম বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ১৮০ টাকা এবং গাজর ১৪০ টাকায়। কেজিতে ২০ টাকা বেড়ে শসা ঠেকেছে ১০০ টাকায়।
এ ছাড়া বাজারে পটল, চিচিঙ্গা, করলা ও ঢেঁড়সের দাম কেজিপ্রতি ১০ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বেড়ে গড়ে ৮০ টাকায় দাঁড়িয়েছে। নতুন আলু ও পেঁপে ৩০ টাকা কেজিতে স্থিতিশীল থাকলেও দেশি ও আমদানিকৃত পেঁয়াজের দাম কেজিতে ১০ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ৬০ টাকায়। গোল বেগুন ও লম্বা বেগুনের দাম জাতভেদে ১২০ থেকে ১৪০ টাকা কেজি।
তবে দরপতনের ব্যতিক্রমী চিত্র দেখা গেছে লাউয়ের বাজারে; আগের সপ্তাহে ৭৫-৮০ টাকায় বিক্রি হওয়া লাউ এখন মিলছে ৬০ টাকায়। অন্যদিকে লালশাক, পালংশাক ও পুঁইশাকসহ সব ধরনের শাকের দাম অপরিবর্তিত রয়েছে।
মাংসের বাজারে কিছুটা বিপরীতমুখী চিত্র লক্ষ্য করা গেছে। দীর্ঘদিনের চড়া বাজারের পর প্রতি কেজিতে ৫০ টাকা কমে গরুর মাংস এখন ৮০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর জন্য কিছুটা স্বস্তি এনে দিয়েছে। তবে খাসির মাংসের দাম অপরিবর্তিত থেকে যথারীতি ১,৩০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
ব্রয়লার মুরগি কেজিতে ২০ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ২০০ টাকায় (গত সপ্তাহে ছিল ১৮০ টাকা)। দেশি মুরগি কেজিপ্রতি ১০০ টাকা পর্যন্ত বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ৬০০ থেকে ৭০০ টাকায়। লেয়ার মুরগি বিক্রি হচ্ছে ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা কেজি দরে।
প্রোটিনের সবচেয়ে সহজলভ্য উৎস হিসেবে পরিচিত ডিমের বাজারও এখন সাধারণ মানুষের জন্য বেশ ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে। বাজারে প্রতি হালি (৪টি) লাল ডিম বিক্রি হচ্ছে ৫২ টাকায়, আর সাদা ডিম ৫০ টাকায়। পাশাপাশি দেশি হাঁসের ডিমের দাম বেড়ে প্রতি হালি দাঁড়িয়েছে ৮০ টাকায়।
মাছের বাজারে বড় জাতের রুই ও কাতল মাছের দাম কেজিতে ১০০ থেকে ১২০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। গত সপ্তাহে ৩২০-৪০০ টাকায় বিক্রি হওয়া মাঝারি ও বড় রুই এখন বিক্রি হচ্ছে ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা কেজি দরে।
অন্যান্য সাধারণ মাছের দাম খাতা-কলমে অপরিবর্তিত থাকলেও সাধারণ ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতার বাইরেই রয়ে গেছে। বাজারে বর্তমানে কোরাল মাছ কেজিপ্রতি ৯৫০ থেকে ১,১০০ টাকা। টেংরা মাছ কেজিপ্রতি ১,০৫০ টাকা। পাবদা মাছ কেজিপ্রতি ৫০০ থেকে ৬৫০ টাকা। ইলিশ মাছ আকার ও ওজনভেদে বিক্রি হচ্ছে ১,১০০ থেকে ২,২০০ টাকা কেজি দরে।
বাজারের এই লাগামহীন দাম বৃদ্ধি স্থবির করে দিয়েছে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা। ফকিরাপুল কাঁচাবাজারে বাজার করতে আসা অটোচালক কালাম নিজের ক্ষোভ ও অবর্ণনীয় কষ্টের কথা জানিয়ে বলেন, “ডাল-ভাত খাইয়া কোনো মতে চলন লাগে। আমাদের মতো মানুষরা খুব অসুবিধায় আছে। সারা দিন কষ্ট কইরা ৫০০ টাকা কামাই করলে বাজারে আইসা এক কেজি চাউল কিনতেই চইলা যায় ৭০-৮০ টাকা। এক কেজি সাধারণ মাছ ২৫০-৩০০ টাকা আর এক কেজি তরকারি ৮০-৯০ টাকা। যে পরিস্থিতি শুরু হইছে, আমরা তো এহন ডাল-ভাতও পেট ভইরা খাবার পাই না।”
সবজি ও খাদ্যপণ্যের এই আকস্মিক মূল্যবৃদ্ধির পেছনে পাইকারি বাজারের কারসাজিকেই দায়ী করছেন খুচরা বিক্রেতারা। ফকিরাপুল কাঁচাবাজারের সবজি ব্যবসায়ী দেলোয়ার হোসেন জানান, পরিবহন খরচ ক্রমাগত বাড়ার পাশাপাশি আড়তদারদের অসাধু সিন্ডিকেটের কারণেই প্রতি সপ্তাহে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে পণ্যের দাম বাড়ানো হচ্ছে।
কাপ্তানবাজার কাঁচাবাজারের মুরগি ব্যবসায়ী সালাম বলেন,“পাইকারি পর্যায়ে আমদানি ও সরবরাহ কম থাকায় গত সপ্তাহের চেয়ে এ সপ্তাহে মুরগির দাম অনেকটা বাড়তি। পরিবহন খরচ বাড়ার চাপও রয়েছে। তবে দাম অতিরিক্ত বেড়ে যাওয়ায় বাজারে ক্রেতার সমাগম ও কেনাকাটার পরিমাণ মারাত্মকভাবে কমে গেছে।”
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, দ্রুত সময়ের মধ্যে সরকারি পর্যায়ে কঠোর বাজার মনিটরিং ও আড়তগুলোর সিন্ডিকেট ভাঙতে না পারলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বিষিয়ে উঠবে।।’

