শিক্ষক সংকটে জোড়াতালি দিয়ে চলছে প্রাথমিক শিক্ষা ৫৬ হাজার ৩৯৫ পদ শূন্য, প্রধান শিক্ষক নেই ৩৬ হাজার ২৩৫ বিদ্যালয়ে 

0
শিক্ষক সংকটে জোড়াতালি দিয়ে চলছে প্রাথমিক শিক্ষা ৫৬ হাজার ৩৯৫ পদ শূন্য, প্রধান শিক্ষক নেই ৩৬ হাজার ২৩৫ বিদ্যালয়ে 

সাইফুল ইসলাম কবিরঃ দেশের শিক্ষাব্যবস্থার ভিত্তি গড়ে ওঠার কথা যে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে, সেখানেই চলছে তীব্র শিক্ষকসংকট। হাজার হাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক নেই। সহকারী শিক্ষকের পদও খালি রয়েছে ২০ হাজারের বেশি। ফলে কোথাও ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষককে প্রশাসনিক দায়িত্ব সামলানোর পাশাপাশি নিয়মিত শ্রেণিপাঠ নিতে হচ্ছে, আবার কোথাও একজন শিক্ষককেই একাধিক শ্রেণির শিক্ষার্থীর পাঠদান করতে হচ্ছে। এতে ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম। কোথাও আবার ভবন আছে, কিন্তু পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই; আবার শিক্ষক থাকলেও নেই প্রয়োজনীয় সংখ্যক শিক্ষার্থী।

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর-সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ৬৫ হাজার ৫৬৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অনুমোদিত শিক্ষক পদ ৪ লাখ ২৯ হাজার ৫৩১টি। এর মধ্যে কর্মরত রয়েছেন ৩ লাখ ৭৩ হাজার ১৩৬ জন। ফলে ৫৬ হাজার ৩৯৫টি শিক্ষক পদ শূন্য, যা মোট অনুমোদিত পদের প্রায় ১৩ শতাংশ। সবচেয়ে উদ্বেগজনক চিত্র প্রধান শিক্ষক পদে—৬৫ হাজার ৫০২টি অনুমোদিত পদের মধ্যে ৩৬ হাজার ২৩৫টি পদই শূন্য।

এক বছরের ব্যবধানে প্রধান শিক্ষক সংকট আরও বেড়েছে। গত বছরের জুলাইয়ে প্রধান শিক্ষকের শূন্য পদ ছিল ৩৪ হাজার ১০৬টি। এক বছরের ব্যবধানে শূন্য পদ বেড়েছে ২ হাজার ১২৯টি। একই সঙ্গে সহকারী শিক্ষকেরও ২০ হাজারের বেশি পদ খালি রয়েছে।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশের বিভিন্ন জেলায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক সংকটের চিত্র অত্যন্ত প্রকট। বগুড়ার ৮০৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক পদ শূন্য রয়েছে। খুলনায় ১ হাজার ১৫৯টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ৬০৫টিতে, গাজীপুরের ৭৭৬টির মধ্যে ২৯৩টিতে, নারায়ণগঞ্জের ৫৪৭টির মধ্যে ৩৪৩টিতে, ফরিদপুরের ৮৮৮টির মধ্যে ৫১৫টিতে এবং রাজবাড়ীর ৪৮১টির মধ্যে ২৭৯টি বিদ্যালয়ে নেই প্রধান শিক্ষক।

একইভাবে বান্দরবানের ৪৩৫টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ১৭৪টিতে, রাজশাহীর ১ হাজার ৫৭টির মধ্যে ৫৮৯টিতে এবং রংপুরের ১ হাজার ৪৫৫টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ৬৬৯টিতে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে।

বরিশাল বিভাগেও সংকট প্রকট। এ বিভাগের ৬ হাজার ২৪৩টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ২ হাজার ৫৯৯টিতেই প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য। পাশাপাশি সেখানে সহকারী শিক্ষকের ৩ হাজার ২৯টি পদও খালি রয়েছে।

দীর্ঘদিন ধরে প্রধান শিক্ষক না থাকায় বিপুলসংখ্যক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষককে ভারপ্রাপ্ত বা চলতি দায়িত্বের প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। ফলে একই ব্যক্তিকে একদিকে বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কাজ, দাপ্তরিক কাগজপত্র, বিভিন্ন সভা ও সরকারি নির্দেশনা বাস্তবায়ন করতে হচ্ছে; অন্যদিকে শ্রেণিকক্ষেও পাঠদান করতে হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, একজন শিক্ষক যখন একই সঙ্গে প্রধান শিক্ষকের প্রশাসনিক দায়িত্ব এবং শ্রেণিকক্ষের পাঠদানের দায়িত্ব পালন করেন, তখন উভয় ক্ষেত্রেই স্বাভাবিক কার্যক্রমে চাপ তৈরি হয়। বিশেষ করে প্রত্যন্ত ও শিক্ষকস্বল্প বিদ্যালয়গুলোতে এ সমস্যা আরও প্রকট।

অনেক বিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন ধরে বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসহ শিক্ষার্থীদের সহশিক্ষা কার্যক্রমও নিয়মিত হচ্ছে না বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। এতে বিদ্যালয়ের প্রতি শিক্ষার্থীদের আগ্রহ কমার পাশাপাশি ঝরে পড়ার প্রবণতাও বাড়ছে।

শুধু শিক্ষকসংকট নয়, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জন্য বৃত্তিতে ৮০ শতাংশ কোটা বরাদ্দ থাকার পরও অনেক বিদ্যালয় থেকে বছরের পর বছর কোনো শিক্ষার্থী বৃত্তি পাচ্ছে না।

শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের মতে, বিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ, শিক্ষকের উপস্থিতি, পাঠদানের মান, শিক্ষার্থীর নিয়মিত উপস্থিতি এবং অভিভাবকদের আগ্রহ—সবকিছুর ওপর প্রাথমিক শিক্ষার মান নির্ভর করে। কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী শিক্ষকসংকট এসব ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবনের ভিত্তি গড়ে ওঠে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। কিন্তু সেই স্তরেই শিক্ষকসংকট, তদারকির ঘাটতি এবং মানসম্পন্ন শিক্ষক নিশ্চিত করার চ্যালেঞ্জ থাকলে এর প্রভাব পরবর্তী শিক্ষাজীবনেও পড়তে পারে বলে মনে করছেন শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা।

তাদের মতে, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শুধু শিক্ষক নিয়োগ করলেই হবে না; যোগ্য ও মেধাবীদের এ পেশায় আকৃষ্ট করতে বেতন-ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা আরও আকর্ষণীয় করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে শিক্ষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, কর্মদক্ষতা মূল্যায়ন এবং বিদ্যালয় পর্যায়ে কার্যকর তদারকি নিশ্চিত করা জরুরি।

তবে সংকট মোকাবিলায় এরই মধ্যে কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ১৪ হাজার ৩৮৪ জন সহকারী শিক্ষক নিয়োগ চূড়ান্ত হয়েছে। তাদের পদায়ন সম্পন্ন হলে বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষকসংকট কিছুটা কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।

এদিকে প্রধান শিক্ষক পদে সহকারী শিক্ষকদের পদোন্নতির জন্য মাঠপর্যায়ে গ্রেডেশন তালিকা তৈরির কাজও চলছে। দীর্ঘদিন ধরে সহকারী শিক্ষক পদে চাকরির অভিজ্ঞতা রয়েছে এবং নির্ধারিত যোগ্যতা পূরণ করেন—এমন শিক্ষকদের জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে। মাঠপর্যায় থেকে পাওয়া তথ্য সফটওয়্যারে সংরক্ষণ করা হচ্ছে। অভিযোগ ও আপত্তি নিষ্পত্তির পর তালিকা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সরকারি কর্ম কমিশনে (পিএসসি) পাঠানোর কথা রয়েছে।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (বিদ্যালয়) মো. লাল হোসেন জানান, সহকারী শিক্ষকদের পদোন্নতির জন্য মাঠপর্যায়ে গ্রেডেশন তালিকা তৈরির কাজ শুরু হয়েছে।

তিনি বলেন, প্রধান শিক্ষকের শূন্য পদের ৮০ শতাংশ পদোন্নতির মাধ্যমে এবং ২০ শতাংশ পদ সরাসরি নিয়োগের মাধ্যমে পূরণ করা হবে। পদোন্নতির ক্ষেত্রে শুধু বয়স নয়, আরও কয়েকটি বিষয় বিবেচনা করা হবে। এখন থেকে নিয়মিতভাবে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শূন্য পদ পূরণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

নতুন নিয়োগ পাওয়া ১৪ হাজার ৩৮৪ জন সহকারী শিক্ষকের পদায়ন শেষ না হওয়া পর্যন্ত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বদলি কার্যক্রমও স্থগিত রাখা হয়েছে। নতুন শিক্ষকদের পদায়নের পর বদলি কার্যক্রম আবার চালু করার কথা রয়েছে।

তবে তখন বর্তমান বদলি নীতিমালা বহাল থাকবে, নাকি নতুন কোনো পদ্ধতি চালু হবে—সে সিদ্ধান্ত পরে নেওয়া হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক নিয়োগের বিষয়ে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ জানান, প্রায় সাড়ে ৩৪ হাজার প্রধান শিক্ষক নিয়োগের প্রয়োজন রয়েছে। এর মধ্যে একটি মামলার কারণে সাড়ে ৩২ হাজার পদ আটকে ছিল। পাশাপাশি সহকারী শিক্ষকদের পদোন্নতিতেও জটিলতা ছিল।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, গত জুলাইয়ে পদোন্নতি সংক্রান্ত আইনি জটিলতা দূর হয়েছে। এখন শূন্য পদ দ্রুত পূরণের বিষয়ে সরকারি কর্ম কমিশনের সঙ্গে আলোচনা চলছে। আগামী এক থেকে দেড় মাসের মধ্যে এ বিষয়ে অগ্রগতি হতে পারে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

শিক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি প্রাথমিক স্তর। অথচ সেই স্তরেই যদি হাজার হাজার বিদ্যালয় প্রধান শিক্ষকবিহীন থাকে এবং সহকারী শিক্ষক পদও দীর্ঘদিন শূন্য পড়ে থাকে, তাহলে শুধু নতুন ভবন, বই কিংবা অবকাঠামো দিয়ে শিক্ষার কাঙ্ক্ষিত মান নিশ্চিত করা কঠিন।

একদিকে প্রশাসনিক দায়িত্বে ব্যস্ত ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক, অন্যদিকে শিক্ষকস্বল্পতায় একাধিক শ্রেণি সামলানো শিক্ষক—এই বাস্তবতায় কতটা কার্যকরভাবে শিশুর মৌলিক শিক্ষা নিশ্চিত হচ্ছে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্টদের মতে, শূন্য পদ পূরণের পাশাপাশি নিয়োগে যোগ্যতা, শিক্ষক ধরে রাখা, নিয়মিত প্রশিক্ষণ, কার্যকর তদারকি এবং বিদ্যালয়ভিত্তিক জবাবদিহি নিশ্চিত করা না গেলে শিক্ষকসংকটের এই জোড়াতালি দীর্ঘমেয়াদে প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।