
বাংলাদেশ প্রতিবেদকঃ আবাসিক হলের শিক্ষার্থীদের আসন বাতিল এবং এক রাতের এসি ও বিদ্যুৎ বিল বাবদ ১২ হাজার ৬০০ টাকা জরিমানার নোটিশকে কেন্দ্র করে রাজধানীর গভর্নমেন্ট কলেজ অব অ্যাপ্লাইড হিউম্যান সায়েন্সে (সাবেক হোম ইকোনমিকস কলেজ) তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে। অধ্যক্ষ অধ্যাপক মেহেরুন্নেছার বিরুদ্ধে ‘স্বেচ্ছাচারিতা’র অভিযোগ তুলে তাঁর তাৎক্ষণিক পদত্যাগের দাবিতে বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) সকাল থেকে শুরু হওয়া আন্দোলন গড়িয়েছে মধ্যরাতের রাজপথে।
ঘটনার সূত্রপাত বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ১০টায়। কলেজের প্রশাসনিক ভবনে অধ্যক্ষের কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন ক্ষুব্ধ ছাত্রীরা। একপর্যায়ে শিক্ষার্থীরা ভবনের মূল ফটক ও অধ্যক্ষের কক্ষ অবরুদ্ধ করে ফেলেন। দিনভর চত্বরে সমবেত হয়ে ‘দফা এক দাবি এক, প্রিন্সিপালের পদত্যাগ’, ‘প্রিন্সিপালের কালো হাত, ভেঙে দাও গুঁড়িয়ে দাও’সহ নানা সরকারবিরোধী ও প্রশাসনবিরোধী স্লোগানে উত্তাল হয়ে ওঠে পুরো ক্যাম্পাস।
প্রায় ১৩ ঘণ্টা টানা অবরুদ্ধ থাকার পর রাত সাড়ে ১১টার দিকে অতিরিক্ত পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতিতে অধ্যক্ষ অধ্যাপক মেহেরুন্নেছাকে নিরাপদে উদ্ধার করে ক্যাম্পাস থেকে বের করে নেওয়া হয়। তবে অধ্যক্ষের অপসারণ ছাড়া আন্দোলন ত্যাগ না করার ঘোষণায় পুলিশি পাহারায় তিনি বেরিয়ে যাওয়ার পরপরই রাজপথে নেমে আসেন শিক্ষার্থীরা।
অধ্যক্ষ ক্যাম্পাস ত্যাগ করার পর শতাধিক ছাত্রী কলেজের সামনের মূল সড়কে অবস্থান নিয়ে মধ্যরাতেও বিক্ষোভ অব্যাহত রাখেন। এতে নিউমার্কেট ও আজিমপুর সংলগ্ন আশপাশের সড়কগুলোতে যান চলাচলে সাময়িক বিঘ্ন ঘটে। গভীর রাতেও সড়কের ওপর বসে শিক্ষার্থীরা অধ্যক্ষের পদত্যাগের এক দফা দাবিতে স্লোগান দিতে থাকেন।
আন্দোলনরত শিক্ষার্থী ও কলেজ প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, দুর্গাপূজার ছুটির আগে কলেজের অডিটোরিয়ামে তিনটি আবাসিক হলের পাঁচ বিভাগের স্নাতকোত্তর শেষ বর্ষের শিক্ষার্থীদের বিদায় অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। প্রথমে রাত ১০টার মধ্যে অনুষ্ঠান শেষ করার শর্ত থাকলেও পরবর্তীতে শিক্ষার্থীদের অনুরোধে সময় বাড়িয়ে রাত ১২টা পর্যন্ত করা হয়। তবে আয়োজন শেষ হতে ভোর ৫টা বেজে যায়।
নির্ধারিত সময়সীমা লঙ্ঘনের অপরাধে অনুষ্ঠানের সমন্বয়কারী দুই শিক্ষার্থীর আবাসিক হলের আসন বাতিলের সিদ্ধান্ত নেন অধ্যক্ষ। শিক্ষার্থীরা জানান, তাঁরা ভুল স্বীকার করে লিখিত ক্ষমা চাইতে গেলে অধ্যক্ষ তাঁদের ক্ষমা গ্রহণ করেন ঠিকই, কিন্তু সিট ফিরিয়ে দেওয়ার শর্ত হিসেবে এক রাতের অডিটোরিয়ামের এসি ও বিদ্যুৎ বিল বাবদ ১২ হাজার ৬০০ টাকা জরিমানার আদেশ দেন।
স্নাতকোত্তরের শিক্ষার্থী তাবাসসুম সাংবাদিকদের বলেন, “দুইজন সাধারণ শিক্ষার্থীর সিট অন্যায়ভাবে বাতিল করা হয়েছিল। আমরা হাত-পা ধরে ক্ষমা চাইলে বলা হয় ক্ষমা করা হয়েছে, কিন্তু শাস্তিস্বরূপ এক রাতের এসির বিল ১২ হাজার ৬০০ টাকা জমা দিতে হবে। সাধারণ শিক্ষার্থীদের পক্ষে এত টাকা জরিমানা দেওয়া কীভাবে সম্ভব?”
শিক্ষার্থীদের অভিযোগের জবাবে সন্ধ্যা নাগাদ সাংবাদিকদের কাছে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেন অধ্যক্ষ অধ্যাপক মেহেরুন্নেছা। তিনি বলেন, “শিক্ষার্থীরা ঘটনার বিপরীত তথ্য ছড়াচ্ছে। রাত ১২টা পর্যন্ত অনুমোদন থাকলেও তারা ভোর ৫টা পর্যন্ত অডিটোরিয়াম ব্যবহার করেছে। এতে প্রতিষ্ঠানের ডিসিপ্লিন নষ্ট হয়েছে। তাই রাগ করে সিট বাতিল করেছিলাম, পরে নমনীয় হয়ে ভবিষ্যতে যেন নিয়মনীতি মেনে চলে সেজন্য এই আর্থিক জরিমানার সিদ্ধান্ত নিই। সারারাত বিদ্যুৎ ও এসি অপচয়ের জরিমানা চাওয়াটাই কি আমার অপরাধ?”
শিক্ষার্থীদের পদত্যাগের দাবির বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি আরও বলেন, “তারা আমাকে একটি সাদা কাগজে পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করতে চাপ দিচ্ছে। আমি কেন তাদের এই অসংবিধানিক দাবির মুখে পদত্যাগ করব?”
মধ্যরাতেও শিক্ষার্থীদের সড়ক অবরোধ অব্যাহত থাকায় এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপর মাধ্যমে অচলাবস্থা নিরসনের চেষ্টা চলছে।
