
এম এ ওয়াহিদ রুলু: মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার শমশেরনগর চা-বাগানে অবস্থিত ক্যামেলিয়া ডানকান ফাউন্ডেশন হাসপাতাল দীর্ঘ ৩৭ দিন ধরে বন্ধ থাকায় চরম চিকিৎসা সংকটে পড়েছেন চা-শ্রমিক ও তাদের পরিবার। ডানকান ব্রাদার্সের পরিচালনাধীন ১৫টি চা-বাগানের প্রায় লক্ষাধিক মানুষ এ হাসপাতালের উপর নির্ভরশীল হলেও বর্তমানে তারা সম্পূর্ণ চিকিৎসা সুবিধা থেকে বঞ্চিত।
এ অবস্থায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে দ্রুত হাসপাতাল চালুর দাবি জানিয়েছেন চা-শ্রমিকরা। গত রোববার (৩ মে) সন্ধ্যায় শমশেরনগরে চা-শ্রমিক সংঘ মৌলভীবাজার জেলা কমিটির এক জরুরি সভা থেকে এ দাবি জানানো হয়।
সভায় সংগঠনের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শ্যামল অলমিকের সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক হরিনারায়ন হাজরার পরিচালনায় বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন সংঘের জেলা সাধারণ সম্পাদক রজত বিশ্বাসসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ।
বক্তারা জানান, গত ২৬ মার্চ রাতে শমশেরনগর চা-বাগানের শ্রমিক বাবুল রবিদাসের ১৩ বছর বয়সী মেয়ে ঐশী রবিদাস অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয় এবং পরদিন সকালে তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ শ্রমিকরা হাসপাতালের চিকিৎসক ও স্টাফদের অবরুদ্ধ করে রাখেন। পরে প্রশাসনের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।
তবে ওই ঘটনার পর থেকেই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নিরাপত্তার অজুহাতে চিকিৎসা সেবা বন্ধ করে দেয়, যা এখনো চালু হয়নি। বক্তারা অভিযোগ করেন, একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে কেন্দ্র করে লক্ষাধিক শ্রমিক পরিবারকে চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত রাখা অমানবিক এবং মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন।
তারা আরও বলেন, ইতোমধ্যে চিকিৎসার অভাবে একাধিক শ্রমিকের মৃত্যুর খবর বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে, যা পরিস্থিতির ভয়াবহতাকে আরও স্পষ্ট করে।
সভায় উঠে আসে চা-শ্রমিকদের করুণ বাস্তবতার চিত্র। দৈনিক মাত্র ১৮৭ টাকা মজুরিতে জীবিকা নির্বাহ করা শ্রমিকদের জন্য চিকিৎসা সেবা ছিল একমাত্র ভরসা। সেই সেবাটুকুও বন্ধ থাকায় তাদের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে।
নেতৃবৃন্দ ২০১৮ সালে বিবিএস ও ইউনিসেফের যৌথ জরিপের তথ্য তুলে ধরে বলেন, চা-বাগানের ৭৪ শতাংশ পরিবার দারিদ্রসীমার নিচে বসবাস করে। শিশুদের মধ্যে অপুষ্টির হার উদ্বেগজনক—৪৫ শতাংশ খর্বকায়, ২৭ শতাংশ শীর্ণকায় এবং প্রায় অর্ধেক শিশু কম ওজনের। এছাড়া কিশোরী বিয়ের হার ৪৬ শতাংশ এবং মা হওয়ার হার ২২ শতাংশ, যা এই জনগোষ্ঠীর সামাজিক অবস্থার চিত্র তুলে ধরে।
উল্লেখ্য, হাসপাতাল চালু, ঐশী রবিদাসের মৃত্যুর সুষ্ঠু তদন্তসহ ৪ দফা দাবিতে গত ১৩ এপ্রিল জেলা প্রশাসক, সিভিল সার্জন ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে স্মারকলিপি প্রদান করা হলেও এখনো কার্যকর কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি।
আন্দোলনের হুঁশিয়ারি: চা-শ্রমিক নেতারা স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, আগামী ১৫ মে’র মধ্যে ক্যামেলিয়া হাসপাতাল চালু না করা হলে কঠোর আন্দোলনে নামবেন তারা। এতে পুরো চা-বাগান এলাকাজুড়ে অস্থিরতা সৃষ্টি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ আসাদুজ্জামান বলেন – চা শ্রমিক সংঘের অনুলিপি পেয়েছি, ক্যামেলিয়া হাসপাতাল চালুর বিষয়ে উচ্চ পর্যায়ে আলোচনা চলছে।
