আন্তর্জাতিক ডেস্ক: মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের নাটকীয় যুদ্ধবিরতি ঘোষণার রেশ কাটতে না কাটতেই পারস্য উপসাগরের নীল জলরাশি রণক্ষেত্রে রূপ নিয়েছে। একদিকে ওয়াশিংটনের ‘অনির্দিষ্টকালের যুদ্ধবিরতি’, অন্যদিকে তেহরানের ‘চমক’ আর ‘পাল্টা আক্রমণ’—এই দ্বিমুখী অবস্থানে টালমাটাল হয়ে পড়েছে বিশ্ব রাজনীতি ও জ্বালানি বাজার।
দীর্ঘ উত্তেজনা ও কড়া হুঁশিয়ারির পর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বৃদ্ধির ঘোষণা দিলেও তাতে যুক্ত করেছেন বিতর্কিত এক শর্ত। তিনি সাফ জানিয়েছেন, যুদ্ধবিরতি চললেও ইরানের ওপর মার্কিন নৌ-অবরোধ অব্যাহত থাকবে।
যুক্তরাষ্ট্রের এই কৌশলকে ‘ছদ্মবেশী যুদ্ধ’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে ইরান। তেহরানের দাবি, যুদ্ধবিরতির আড়ালে পেন্টাগন আসলে বড় কোনো হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এর আগে সিএনবিসি-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেছিলেন, “আমাদের সেনারা ফের যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। ইরান চুক্তি না করলে হামলা অনিবার্য।”
ট্রাম্পের বার্তার পাল্টা জবাব হিসেবে ইরান কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি কার্যত অচল করে রেখেছে। বুধবার ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) দাবি করেছে যে, তারা প্রণালিতে অন্তত তিনটি জাহাজে হামলা চালিয়েছে এবং দুটি জাহাজ জব্দ করেছে।
যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস (ইউকেএমটিও) হামলার সত্যতা নিশ্চিত করে জানিয়েছে, ওমানের ১৫ নটিক্যাল মাইল উত্তর-পূর্বে একটি জাহাজে আইআরজিসি’র গানবোট থেকে গুলি চালানো হয়। এতে জাহাজটির কমান্ড ডেক মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইরানের ৮ নটিক্যাল মাইল পশ্চিমে একটি কার্গো জাহাজে গুলি চালানো হয়। জাহাজটি বর্তমানে ওই এলাকায় আটকা পড়ে আছে। ইউকেএমটিও নিশ্চিত করেছে যে, উভয় জাহাজের ক্রুরা এখন পর্যন্ত নিরাপদ রয়েছেন।
ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিম নিউজ এক চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদনে জানিয়েছে, তেহরান নতুন যুদ্ধের জন্য কেবল প্রস্তুতই নয়, বরং তারা বিপুল পরিমাণ ‘চমক’ মজুত রেখেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন যুদ্ধ শুরু হলে মার্কিন ও ইসরাইলিদের জীবন আবারও ‘নারকীয়’ হয়ে উঠবে।
নৌ-অবরোধ বহাল থাকা অবস্থায় নতুন কোনো আলোচনায় বসতে নারাজ তেহরান। তাদের স্পষ্ট কথা—আমেরিকার অতিরিক্ত দাবি ও অবরোধ বজায় থাকলে আলোচনার টেবিলের চেয়ে যুদ্ধক্ষেত্রই তাদের কাছে বেশি গুরুত্ব পাবে।
বিশ্বজুড়ে যখন জ্বালানি সংকট চরমে, তখন এই পরিস্থিতি শান্ত করতে উদ্যোগ নিয়েছে পাকিস্তান। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসমাইল বাঘেই এক টেলিগ্রাম বার্তায় জানিয়েছেন “পাকিস্তান যুদ্ধবিরতির বিষয়ে যে অনুরোধ করেছে, তেহরান তা বিবেচনা করছে। তবে জাতীয় নিরাপত্তা ও স্বার্থ রক্ষায় ইরান প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পিছপা হবে না।”
বিবিসি’র বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে একই দিনে তিনটি জাহাজে হামলার ঘটনা ট্রাম্পের ঘোষিত যুদ্ধবিরতির কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দিতে পারে। তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যকার এই ‘ছায়াযুদ্ধ’ যে কোনো মুহূর্তে সরাসরি সংঘাতের রূপ নিতে পারে, যা গোটা মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।

