নিট কেলেঙ্কারিতে উত্তপ্ত দিল্লি: ‘ককরোচ’ আন্দোলনে যুক্ত হলো বিরোধী জোট, রাহুল গান্ধীর ৩ দাবি ও সরকারকে কঠোর হুঁশিয়ারি

0
নিট কেলেঙ্কারিতে উত্তপ্ত দিল্লি: ‘ককরোচ’ আন্দোলনে যুক্ত হলো বিরোধী জোট, রাহুল গান্ধীর ৩ দাবি ও সরকারকে কঠোর হুঁশিয়ারি

আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ ভারতে নিট (NEET) পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং শিক্ষা ব্যবস্থার অনিয়মকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ছাত্র আন্দোলন এখন নজিরবিহীন রূপ নিয়েছে। সামাজিক মাধ্যমে কয়েকজন শিক্ষার্থীর ক্ষুদ্র প্রতিবাদ থেকে শুরু হওয়া ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)-র আন্দোলন এখন ভারতের রাজধানী দিল্লির যন্তর-মন্তর ছাড়িয়ে পুরো দেশের রাজনীতিতে বড় ধরনের তোলপাড় সৃষ্টি করেছে।

আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে এটিই তার শাসনের মুখোমুখি হওয়া সবচেয়ে বড় ও সংগঠিত যুব-নেতৃত্বাধীন আন্দোলন। প্রায় ২০ লাখ পরীক্ষার্থীর অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ, বারবার প্রশ্ন ফাঁস এবং এর জেরে একাধিক শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার ঘটনা দেশের তরুণ সমাজকে এক অভূতপূর্ব ক্ষোভের মুখে দাঁড় করিয়েছে।

আন্দোলনকারীদের এই ব্যঙ্গাত্মক নামকরণের পেছনে রয়েছে সুপ্রিম কোর্টের একটি বিতর্কিত মন্তব্য। বেকার তরুণ ও চাকরিপ্রার্থীদের একটি দলকে পূর্বে আদালতের এক পর্যবেক্ষণে ‘ককরোচ’ বা আরশোলার সঙ্গে তুলনা করা হয়েছিল বলে গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে। এর প্রতিবাদ ও ক্ষোভ থেকে শিক্ষার্থীরা নিজেদের রাজনৈতিক আন্দোলনের নাম দেন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (CJP)।

সম্প্রতি আন্দোলনকারীরা উচ্চ আদালতে লাঠিচার্জের ভিডিও দেখিয়ে বিচার পাওয়ার চেষ্টা করলে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের বেঞ্চ তা নাকচ করে দেন এবং বলেন, “আমাদের সময় নষ্ট করবেন না।” তবে বিচার বিভাগের এই উদাসীনতা ও মন্তব্য তরুণদের পিছু হটানোর বদলে আরও ঐক্যবদ্ধ করেছে।

আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের পাশে শক্ত অবস্থান নিয়েছে লোকসভার বিরোধী দলীয় নেতা রাহুল গান্ধী এবং পুরো বিরোধী জোট (INDIA)। দিল্লির ইন্দিরা ভবনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বিগত এক দশকের পরিসংখ্যান তুলে ধরে রাহুল গান্ধী বলেন “গত ১০ বছরে দেশে ১৫২টি প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটেছে—অর্থাৎ গড়ে প্রতি মাসে একটি করে পরীক্ষা ভেস্তে গেছে! প্রায় সাড়ে সাত কোটি শিক্ষার্থী ও তাদের পরিবার এতে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও আজ পর্যন্ত এই সিন্ডিকেটের কাউকে উপযুক্ত সাজা দেওয়া হয়নি।”

কংগ্রেস নেতা আন্দোলনকারীদের দাবির সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে সরকারের সামনে ৩টি মূল শর্ত জুড়ে দিয়েছেন।

কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের তাৎক্ষণিক পদত্যাগ। নিরীহ শিক্ষার্থীদের ওপর নির্বিচারে লাঠিচার্জের নির্দেশদাতা ও বাস্তবায়নকারী পুলিশ কর্মকর্তাদের কঠোর আইনি জবাবদিহি। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির স্বশরীরে শিক্ষার্থীদের মুখোমুখি হয়ে প্রকাশ্যে ক্ষমা প্রার্থনা।

রাহুল গান্ধী স্পষ্ট করে দেন, সংসদের ভেতর আলোচনা এড়িয়ে গেলে রাস্তায় নেমে সরকার ঘেরাও করা ছাড়া বিরোধী দলের আর কোনো পথ খোলা নেই।

আন্দোলনকে সমর্থন জানিয়ে রাস্তায় নামা কংগ্রেস কর্মীদের সঙ্গে বিজেপি সমর্থকদের ভয়াবহ সংঘর্ষ হয়েছে। উভয় পক্ষ লাঠি ও ইট-পাটকেল ব্যবহার করলে রণক্ষেত্রে পরিণত হয় এলাকা। পুলিশ এসে ব্যাপক লাঠিচার্জ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

দিল্লিতে নিরাপত্তার স্বার্থে এবং আন্দোলনকারীরা যাতে ছড়িয়ে পড়তে না পারে, সেজন্য পুলিশ যন্তর-মন্তরসহ আশপাশের এলাকা সিল করে দিয়েছে। দিল্লি মেট্রো কর্তৃপক্ষ কেন্দ্রীয় রাজধানীর ১৬টি গুরুত্বপূর্ণ মেট্রো স্টেশন সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করেছে।

পার্লামেন্ট ভবনের সামনে বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্যরা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ও শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ দাবিতে কালো পোশাক পরে অবস্থান নেন। এর আগে প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ভাদ্রা, অখিলেশ যাদব ও রাহুল গান্ধীকে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন ঘেরাওয়ের চেষ্টার সময় সাময়িকভাবে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছিল।

‘ককরোচ জনতা পার্টি’-র নেতৃবৃন্দ মোদি সরকারের সমঝোতার প্রস্তাব নিয়ে নতুন শর্ত দিয়েছে, দলের মুখপাত্র সৌরভ দাস জানিয়েছেন, স্বাস্থ্যমন্ত্রী জেপি নাড্ডা আলোচনার আগ্রহ দেখালেও সিজেপি নেতৃত্ব আর কোনো মন্ত্রীর দপ্তরে বা সরকারি কক্ষে গিয়ে বৈঠকে বসবে না। প্রয়োজনে যন্তর- মন্তরের কাছাকাছি নিরপেক্ষ কোনো স্থানে খোলা আলোচনা হতে পারে।

অপর মুখপাত্র আশুতোষ রাঙ্কা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, সরকার দাবি না মানলে এই সপ্তাহেই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লাখ লাখ মানুষ এসে দিল্লিতে অবস্থান নেবে।

বিখ্যাত মারাঠা কোটা আন্দোলনের নেতা মনোজ জারাঙ্গে পাটিল ব্যক্তিগতভাবে যন্তর-মন্তরে এসে সিজেপি-র প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন এবং শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের যৌক্তিকতা তুলে ধরেছেন।

টানা আন্দোলনের মুখে সরকারের পক্ষ থেকে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা চালানো হচ্ছে দীর্ঘদিন নীরব থাকার পর শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান ‘এক্সে’ (টুইটার) লিখেছেন, কেন্দ্র সংসদে নিট নিয়ে আলোচনা এবং শিক্ষার্থীদের সমস্যার সমাধানে “শতভাগ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ”। তবে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক চালচালানির গুটি হিসেবে ব্যবহার করা অনুচিত।

প্রধানমন্ত্রী মোদি প্রশ্ন ফাঁসের সঙ্গে জড়িতদের কঠোর শাস্তির প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তবে সরকারি সূত্রের বরাতে জানা গেছে, কেন্দ্র সংসদে নিট ইস্যুতে দীর্ঘ আলোচনায় রাজি হলেও শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি কোনো অবস্থাতেই মানবে না।

প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং দাবি করেছেন, কিছু রাজনৈতিক দল শিক্ষার্থীদের কাঁধে বন্দুক রেখে নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করার চেষ্টা করছে।

সোনম ওয়াংচুক, আহত সাকশী ও পুলিশের নতুন নির্দেশমালা

অনশনরত বিখ্যাত সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুককে আদালতের নির্দেশে মেদান্ত হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। সেখানে মন্ত্রী জেপি নাড্ডা ও অন্য নেতারা গিয়ে তার খোঁজ নেন। ওয়াংচুক জানিয়েছেন, আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে ভবিষ্যতে পুলিশ কোনো আইনি হয়রানি বা মামলা করবে না—এমন লিখিত গ্যারান্টি দিলে তিনি অনশন ভাঙবেন।

পুলিশের বেপরোয়া লাঠিচার্জে গুরুতর আহত ২১ বছর বয়সী আন্দোলনকারী সাকশীর শারীরিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়েছে। রাম মনোহর লোহিয়া হাসপাতালের চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, তার মস্তিষ্ক ও মেরুদণ্ডের এমআরআই রিপোর্ট স্বাভাবিক এসেছে এবং তাকে ভেন্টিলেটর থেকে বের করা হয়েছে।

সাধারণ পোশাকে পুলিশ কর্মীদের লাঠিচার্জ করার ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর তীব্র সমালোচনা তৈরি হয়। এর প্রেক্ষিতে দিল্লি পুলিশের উচ্চপর্যায় থেকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে, যন্তর-মন্তর ও আশপাশের এলাকায় দায়িত্বরত সব পুলিশ সদস্যকে অবশ্যই দৃশ্যমান ইউনিফর্ম পরে ডিউটি করতে হবে।

অনুপম খেরের মতো নিরপেক্ষ তারকারাও শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনকে সম্মান জানানোর আহ্বান জানিয়েছেন। সব মিলিয়ে, শিক্ষার্থীদের দাবি ও মোদি সরকারের অনড় অবস্থানের কারণে দিল্লির ‘ককরোচ আন্দোলন’ এখন এক চরম অনিশ্চয়তা ও ঐতিহাসিক মোড় নেওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে।