দিল্লির উদ্বেগ বাড়িয়ে ঢাকা-ইসলামাবাদ নতুন সমীকরণ: আঞ্চলিক কূটনীতিতে ‘কৌশলগত ভারসাম্য’ খুঁজছে বাংলাদেশ

0
দিল্লির উদ্বেগ বাড়িয়ে ঢাকা-ইসলামাবাদ নতুন সমীকরণ: আঞ্চলিক কূটনীতিতে 'কৌশলগত ভারসাম্য' খুঁজছে বাংলাদেশ

আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ শেখ হাসিনা-পরবর্তী বাংলাদেশে ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর পররাষ্ট্রনীতির গতিপ্রকৃতিতে দৃশ্যমান আমূল পরিবর্তন আসছে। দীর্ঘদিনের চেনা বৃত্ত ভেঙে বাংলাদেশ এখন পাকিস্তান ও চীনের দিকে কূটনৈতিক হাত বাড়াচ্ছে, যা চিরবৈরী প্রতিবেশী ভারতের নীতিনির্ধারকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। বিশেষ করে, পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রক্রিয়া এবং দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ইসলামপন্থি দলগুলোর সম্ভাব্য প্রভাব বৃদ্ধিকে ভারতের নিরাপত্তা মহলে একটি বড় ‘অস্বস্তি’ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, ঐতিহ্যগতভাবেই বাংলাদেশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণের একটি বড় এবং বিশ্বস্ত কেন্দ্র ছিল ভারতের বিভিন্ন নামী প্রতিষ্ঠান। কিন্তু সম্প্রতি এই চেনা ধারায় একটি বড় প্রতীকী বদল এসেছে।

চলতি মে মাসের ৪ থেকে ২১ তারিখ পর্যন্ত পাকিস্তানের লাহোরের সিভিল সার্ভিসেস একাডেমিতে একটি বিশেষ নির্বাহী প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে অংশ নেন বাংলাদেশের ১২ জন জ্যেষ্ঠ আমলা। বিশ্লেষকদের মতে, ছোট আকারের হলেও এই দলটির পাকিস্তান সফর অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এটি প্রমাণ করে যে, পূর্ববর্তী সরকারের ‘আবেগনির্ভর’ একমুখী নীতি পরিহার করে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকার একটি সার্বভৌম ও ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক পরিসর তৈরি করতে শুরু করেছে।

বাংলাদেশের এই নতুন কৌশলের ওপর গভীর নজর রাখছে নয়াদিল্লি। ভারতের হরিয়ানাভিত্তিক ও.পি. জিন্দাল গ্লোবাল বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক শ্রীরাধা দত্ত বলেন, “শেখ হাসিনা সরকারের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের মধ্যে একটি ঐতিহাসিক ও আবেগগত উপাদান ছিল। তবে তারেক রহমানের নতুন সরকার পারস্পরিক লাভজনক চুক্তি নিশ্চিত করতে পুরোপুরি বাস্তববাদী ও বাণিজ্যিক (Business-like) দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করছে। ঢাকা মূলত এই অঞ্চলে একটি ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করছে।”

তবে ভারতের নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মূল ভয় অন্য জায়গায়। ঢাকার এই পাকিস্তান ঘনিষ্ঠতা এবং জামায়াতে ইসলামীর মতো ইসলামপন্থি দলগুলোর ক্রমবর্ধমান সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাব ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্তে (চিকেনস নেক বা শিলিগুড়ি করিডর সংলগ্ন এলাকা) পুরোনো নিরাপত্তা ঝুঁকিগুলোকে আবারও উসকে দিতে পারে বলে দিল্লির আশঙ্কা।

পাকিস্তানের পাশাপাশি বেইজিংয়ের সঙ্গেও ঢাকার সংযোগ এখন বেশ জোরালো। চলতি মাসের শুরুতে বাংলাদেশ তিস্তা নদী পুনরুদ্ধার ও খনন প্রকল্পে বিপুল সহায়তার জন্য চীনের কাছে আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জানিয়েছে। ভৌগোলিক দিক থেকে তিস্তা নদীটি ভারতের অতি সংবেদনশীল ‘শিলিগুড়ি করিডর’-এর পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে, যা ভারতের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোকে যুক্ত করেছে। এই কৌশলগত প্রকল্পে চীনের প্রবেশ নিশ্চিত করার চেষ্টা ভারতের ভূ-রাজনৈতিক উদ্বেগকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

ভারতের অশোকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক উদয় চন্দ্রের মতে “উদ্বেগটা হলো, ঢাকা এখন দিল্লির সঙ্গে সম্পর্ক নতুন করে নির্ধারণের ক্ষেত্রে চীন ও পাকিস্তানকে ‘দরকষাকষির হাতিয়ার’ (Bargaining Chip) হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। ভারতের এখন একটি নতুন ‘বাংলাদেশ নীতি’ প্রয়োজন, যা কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা দলের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে বাংলাদেশের জনমতের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হবে।”

কূটনৈতিক টানাপোড়েন ও শীতলতা সত্ত্বেও ভৌগোলিক অবস্থান, বাণিজ্য এবং জ্বালানি নিরাপত্তার কারণে বাংলাদেশ ও ভারত একে অপরের পরিপূরক হিসেবেই থাকবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।

ইরান যুদ্ধজনিত বৈশ্বিক সংকটের কারণে বাংলাদেশে যখন তীব্র জ্বালানি ও ডলার সংকট দেখা দেয়, তখন দ্বিপক্ষীয় চুক্তির আওতায় ভারতকে জরুরি ভিত্তিতে অতিরিক্ত ডিজেল ও বিদ্যুৎ সরবরাহ করে ঢাকার পাশে দাঁড়াতে দেখা গেছে। বাংলাদেশের ৫০০ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক খাতের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচা তুলা, সুতা এবং খাদ্য নিরাপত্তার জন্য অতি জরুরি পেঁয়াজ, গম ও চালের মতো নিত্যপণ্যের ক্ষেত্রে ভারতই সবচেয়ে সাশ্রয়ী ও দ্রুততম উৎস।

লন্ডনভিত্তিক গবেষক প্রিয়জিৎ দেবসরকার মনে করিয়ে দেন, দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক সংকটে জর্জরিত পাকিস্তানের উৎপাদন ও বাণিজ্যিক অবকাঠামো বাংলাদেশের আমদানি চাহিদা মেটানোর জন্য কোনোভাবেই যথেষ্ট নয়। করোনাকালীন দুর্যোগ কিংবা যুদ্ধকালীন সংকট—উভয় ক্ষেত্রেই ভারতের ভৌগোলিক নৈকট্য বাংলাদেশের জন্য অপরিহার্য।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে শত্রুতা চাচ্ছে না, বরং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সীমান্ত হত্যা, পানি বণ্টন এবং ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আশ্রয়ের মতো বিষয়গুলোতে আরও কঠোর ও অনমনীয় অবস্থান নিতে পারে। তবে যেখানে দেশের লাভ স্পষ্ট—যেমন জ্বালানি, সার, বাণিজ্য ও আঞ্চলিক যোগাযোগ—সেখানে ঢাকা দিল্লির সঙ্গে সহযোগিতা ঠিকই অব্যাহত রাখবে। এটি রাষ্ট্রের মৌলিক অবস্থান বদলে ফেলার কোনো উদ্যোগ নয়, বরং আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী ও স্বাধীন করার একটি সুনিপুণ প্রয়াস।