
আন্তর্জাতিক ডেক্স: মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান সামরিক উত্তেজনা ও আঞ্চলিক যুদ্ধ পরিস্থিতির টানা ধাক্কা পড়েছে মার্কিন সামরিক বহরে। দীর্ঘ প্রায় আট মাস (২৫০ দিনেরও বেশি সময়) ধরে বিরামহীনভাবে সমুদ্রে অবস্থান করছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহী পরাক্রমশালী পরমাণু চালিত যুদ্ধজাহাজ ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন’। তবে নিয়মিত মেরামত ও রসদ সরবরাহ না পাওয়ায় রণতরীটির ভেতরে সৃষ্টি হয়েছে নজিরবিহীন মানবিক বিপর্যয়।
চরম খাদ্য সংকট, সুপেয় পানির অভাব, বন্ধ হয়ে যাওয়া টয়লেট ব্যবস্থা এবং জাহাজের বিকট শব্দে মার্কিন সেনাসদস্যরা মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছেন। একাধিক নাবিক সাগরে লাফ দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা পর্যন্ত চালিয়েছেন। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে মার্কিন কংগ্রেসের আইনপ্রণেতাদের তোপের মুখে পড়ে শেষপর্যন্ত রণতরীটি বদল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাইডেন-ট্রাম্প প্রশাসন ও পেন্টাগন।
জাহাজটিতে বর্তমানে প্রায় পাঁচ হাজার মার্কিন সেনাসদস্য ও নৌ কর্মকর্তা অবস্থান করছেন। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী জাহাজের ভেতরের পরিস্থিতি এখন অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। দীর্ঘদিন নতুন রসদ না পৌঁছানোয় নাবিকদের পচা ও বাসি খাবার সরবরাহ করা হচ্ছে। এছাড়া স্যুয়েজ ও ওয়াটার পিউরিফায়ার সিস্টেমে গোলযোগের কারণে সুপেয় পানির তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে।
জাহাজের মূল পয়ঃনিষ্কাশন লাইন বা স্যানিটেশন ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়েছে। নর্দমার বর্জ্য উপচে পড়ায় বাথরুম ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে উঠেছে। এমনকি কাপড় কাচার লন্ড্রি সেবাও দীর্ঘদিন ধরে অকার্যকর। এক সেনাসদস্যের পরিবার জানিয়েছেন, অনবরত জাহাজের ইঞ্জিনের বিকট শব্দ, অমানুষিক ক্লান্তি এবং পুষ্টিহীনতায় ওই সেনাসদস্য প্রায় ২৯ কেজি (৬৫ পাউন্ড) ওজন হারিয়েছেন।
মানসিকভাবে ভারসাম্য হারিয়ে গত কয়েক সপ্তাহে একাধিক সেনাসদস্য সমুদ্রে লাফিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা চালান। সম্প্রতি সাগরে লাফ দেওয়া এক সেনাকে মুমূর্ষু অবস্থায় উদ্ধার করে এয়ারলিফট করে সামরিক হাসপাতালে পাঠানো হয়।
যুদ্ধজাহাজের এমন ভয়াবহ পরিস্থিতি সামনে আসতেই মার্কিন রাজনৈতিক অঙ্গনে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। ক্ষমতাসীন ও বিরোধী ডেমোক্র্যাট সিনেটররা পেন্টাগনের দায়িত্বহীনতা নিয়ে তীব্র প্রশ্ন তুলেছেন।
মার্কিন সিনেট আর্মড সার্ভিসেস কমিটির সদস্য ডেমোক্র্যাট সিনেটর রিচার্ড ব্লুমেন্থাল সরাসরি পেন্টাগন প্রধান পিট হেগসেথকে (Pete Hegseth) কড়া চিঠি পাঠিয়েছেন। চিঠিতে তিনি স্যানিটেশন সংকট ও পচা খাবার সরবরাহের বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরে সেনাসদস্যদের অবিলম্বে উদ্ধারের দাবি জানান। অপর প্রভাবশালী সিনেটর রুবেন গাল্লেগো ঘটনাটির সত্যতা যাচাইয়ে এক প্রতিনিধি দলকে সরজমিনে ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন পরিদর্শনের অনুমতি দেওয়ার জোর দাবি জানান।
বিতর্কের মুখে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ সেনাসদস্যদের কষ্টের খবর পুরোপুরি অস্বীকার না করলেও দাবি করেছেন, “সংবাদমাধ্যমে ঘটনাটিকে কিছুটা অতিরঞ্জিত করে দেখানো হচ্ছে।” যেকোনো পরিস্থিতিতে মার্কিন সেনাদের সুস্বাস্থ্য ও মর্যাদা রক্ষায় পেন্টাগন প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলে তিনি জানান।
অন্যদিকে মার্কিন নৌবাহিনীর (US Navy) মুখপাত্র জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান রণকৌশলগত অবস্থানের কারণে সরবরাহকারী জাহাজগুলো সময়মতো পৌঁছাতে কিছুটা বিলম্ব হয়েছে। তবে বর্তমানে বিকল্প উপায়ে পানীয় জল ও খাদ্য সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় দীর্ঘ মোতায়েন শেষে অবশেষে ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনকে যুক্তরাষ্ট্রের বন্দরে ফিরিয়ে আনার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
পেন্টাগন জানিয়েছে, খুব শীঘ্রই ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের জায়গায় নতুনভাবে দায়িত্ব নিতে মধ্যপ্রাচ্যের উদ্দেশ্যে রওনা হবে আরেক মার্কিন রণতরী ‘ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটন’ (USS George Washington)। নতুন জাহাজটি এসে পৌঁছালেই লিংকন তার বিশাল বহর নিয়ে নিজ দেশে ফিরে যেতে পারবে।
