আদালত প্রতিবেদকঃ ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট। ছাত্র-জনতার উত্তাল মিছিলে যখন ঢাকা মুখরিত, ঠিক সেই সময়ে রাজধানীর চানখাঁরপুল মোড় পরিণত হয়েছিল এক বিভীষিকাময় যুদ্ধক্ষেত্রে। সেইদিন ৬ ছাত্র-জনতাকে গুলিতে হত্যার দায়ে আজ রায় ঘোষণা করতে যাচ্ছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। বিচারপতি গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল আজ সকাল থেকে এই মামলার রায়ের কার্যক্রম শুরু করবেন, যা বিটিভিতে সরাসরি সম্প্রচার করা হবে।
নিজ বাহিনীর বিরুদ্ধেই ৩ পুলিশের জবানবন্দিঃ
এই মামলার বিচারে সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে কাজ করেছে ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকা তিন পুলিশ সদস্যের সাহসী জবানবন্দি। কনস্টেবল অজয় ঘোষ, আব্দুর রহমান ও আসিফ খান ট্রাইব্যুনালে সেদিনের যে বর্ণনা দিয়েছেন, তা শিউরে ওঠার মতো।
রাইফেল কেড়ে নিয়ে গুলি: কনস্টেবল অজয় ঘোষ জানান, তার নামে ইস্যুকৃত চাইনিজ রাইফেল ও ৪০ রাউন্ড গুলি ছিল। কিন্তু তিনি নিরস্ত্র মানুষের ওপর গুলি চালাতে অস্বীকৃতি জানান। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে এডিসি আক্তারুল ইসলাম তাকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে বলেন, “সরকারি বেতন-রেশন খাস না, গুলি করবি না কেন?” এরপর এডিসি তার হাত থেকে রাইফেল কেড়ে নিয়ে কনস্টেবল সুজনকে দিয়ে দেন এবং সুজন নির্বিচারে গুলি শুরু করে।
২২ রাউন্ড গুলির হিসাব: শাহবাগ থানায় অস্ত্র জমা দেওয়ার সময় সুজন জানায়, সে ২২ রাউন্ড গুলি ফায়ার করেছে।
উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কমান্ড: কনস্টেবল আব্দুর রহমান জানান, শহীদ মিনার থেকে আন্দোলনকারীদের হটিয়ে চানখাঁরপুল চৌরাস্তায় এনে পরিকল্পিতভাবে ঘেরাও করে গুলি করার নির্দেশ দিয়েছিলেন এডিসি আক্তার ও এসি ইমরুল।
কারা ছিলেন নেপথ্যে? (কমান্ড রেসপনসিবিলিটি)ঃ
তদন্ত প্রতিবেদনে আটজন পুলিশ কর্মকর্তাকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। তদন্ত সংস্থার মতে, তৎকালীন ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমানের সরাসরি নির্দেশে চারজন উর্ধ্বতন কর্মকর্তা মাঠে থেকে এই হত্যাকাণ্ড পরিচালনা করেন। তারা হলেন: ১. সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান (পলাতক) ২. সাবেক যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী (পলাতক) ৩. সাবেক এডিসি শাহ আলম মো. আক্তারুল ইসলাম (পলাতক) ৪. সাবেক এসি মো. ইমরুল (পলাতক) ৫. পরিদর্শক (অপারেশন) আরশাদ হোসেন (গ্রেপ্তার)
এদের নির্দেশে সরাসরি ট্রিগার চেপেছিলেন কনস্টেবল সুজন, ইমাজ ও নাসিরুল, যারা বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন।
রক্তে ভেজা ৬টি প্রাণঃ
চানখাঁরপুলের সেই হামলায় শাহরিয়ার খান আনাস, শেখ মাহদি হাসান জুনায়েদ, মো. ইয়াকুব, মো. রাকিব হাওলাদার, মো. ইসমামুল হক ও মানিক মিয়া শহীদ হন। ট্রাইব্যুনালে প্রথম সাক্ষী হিসেবে সাক্ষ্য দেন শহীদ আনাসের বাবা শাহরিয়ার খান পলাশ, যার জবানবন্দি আদালতকে আবেগাপ্লুত করেছিল।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর সহিদুল ইসলাম সরদার বলেন, “আমরা ২৬ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য এবং অকাট্য দালিলিক প্রমাণাদি উপস্থাপন করেছি। আসামিদের দোষ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত। আমরা সর্বোচ্চ সাজা অর্থাৎ মৃত্যুদণ্ড দাবি করেছি।”
তিনি আরও জানান: পলাতক ৪ আসামির বিরুদ্ধে পুনরায় ইন্টারপোলের রেড নোটিশ জারির আবেদন করা হবে। আসামিদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে তা শহীদ পরিবার ও আহতদের ক্ষতিপূরণ হিসেবে প্রদানের জন্য বিশেষ আবেদন করা হয়েছে।
এটি পুনর্গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দ্বিতীয় রায়। গত ২০শে এপ্রিল তদন্ত সংস্থা তাদের প্রথম প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়া শেষে আজ এই চূড়ান্ত রায় আসতে যাচ্ছে। সারা দেশের মানুষের দৃষ্টি এখন ট্রাইব্যুনালের দিকে, কারণ এই রায়ের মাধ্যমে জুলাই-আগস্ট বিপ্লবের গণহত্যার বিচারের একটি নতুন মাইলফলক রচিত হতে যাচ্ছে।

