ফাঁসির দাবিতে উত্তাল রাজপথ, কুলখানিতে কাঁদলেন মা-বাবা: শিশু রামিসা হত্যার বিচারে ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম

0
ফাঁসির দাবিতে উত্তাল রাজপথ, কুলখানিতে কাঁদলেন মা-বাবা: শিশু রামিসা হত্যার বিচারে ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম

বাংলাদেশ প্রতিবেদকঃ রাজধানীর পল্লবীতে আট বছরের শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে গলা কেটে হত্যার ঘটনায় গণবিস্ফোরণ ঘটেছে। অপরাধীদের দ্রুততম সময়ে সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে শুক্রবার (২২ মে) রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে বিভাগীয় শহর খুলনা পর্যন্ত ক্ষোভের আগুনে উত্তাল ছিল রাজপথ। এদিকে, বুকফাটা আর্তনাদ আর সন্তান হারানোর তীব্র শোক নিয়ে গতকালই ঢাকার বাসা ছেড়ে মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখানের গ্রামের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছেন রামিসার বাবা-মা। সেখানে আজ শনিবার রামিসার কুলখানি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।

গত বৃহস্পতিবার (২১ মে) রাতেই মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখানে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয় ছোট্ট রামিসাকে। মেয়ের শেষ আবদার পূরণ করতে মাত্র দুদিন আগেই একটি বোরকা কিনে এনেছিলেন বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা। কিন্তু সেই বোরকা আর গায়ে জড়ানো হলো না রামিসার। সিরাজদিখানে যাওয়ার পথে মেয়ের জামাকাপড় বুকে জড়িয়ে মায়ের গগনবিদারী আর্তনাদ ও বাবার বারবার মূর্ছা যাওয়ার দৃশ্যে বাতাস ভারী হয়ে ওঠে।

শুক্রবার সকাল থেকেই পল্লবীর সেকশন-১১ এলাকায় রামিসাদের বাসার সামনে জড়ো হতে থাকেন সর্বস্তরের মানুষ। বিভিন্ন সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের ব্যানারে সেখানে বিশাল মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালিত হয়।

বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আন্দোলন রূপ নেয় জনসমুদ্রে। দুপুরের দিকে বিক্ষুব্ধ জনতা মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বর ও আশপাশের সড়ক অবরোধ করে অবস্থান নেন। ‘জাস্টিস ফর রামিসা’, ‘আমার বোন খুন হলো কেন?’, ‘অপরাধীর আস্তানা ভেঙে দাও, গুঁড়িয়ে দাও’—এমন তীব্র স্লোগানে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে পুরো মিরপুর এলাকা।

বিক্ষোভকারীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন “দেশে বিচারহীনতা ও আইনের দীর্ঘসূত্রতার কারণেই বারবার এমন নৃশংসতা ঘটছে। আমরা কোনো ৭ দিন বা ১ মাসের দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া চাই না। আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ঘাতকের ফাঁসি কার্যকর করতে হবে।”

মিরপুর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. হাফিজুর রহমান জানান, পরিস্থিতি সামাল দিতে এবং জনসাধারণের দুর্ভোগ কমাতে পুলিশ সড়কের একটি লেন দিয়ে যান চলাচল স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

রামিসা হত্যার দ্রুত বিচার এবং দেশব্যাপী নারী ও শিশুদের ওপর চলমান সহিংসতার প্রতিবাদে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন করেছে ইসলামী ছাত্রীসংস্থা ঢাকা মহানগরী দক্ষিণ শাখা। মানববন্ধন থেকে ৩টি মূল দাবি উত্থাপন করা করা হয়: রামিসা হত্যাকাণ্ডের দ্রুত ও স্বচ্ছ বিচার নিশ্চিত করে ধর্ষক-খুনির সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়া। নারী ও শিশু নির্যাতনের সব ঘটনার সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করা। মামলা পরিচালনায় প্রশাসনের কোনো কর্মকর্তার গাফিলতি প্রমাণিত হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া।

সংগঠনটির নেত্রীরা মাদকের সহজলভ্যতা বন্ধ, পর্নো ওয়েবসাইট নিষিদ্ধকরণ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নৈতিক শিক্ষার প্রসারের জোর দাবি জানান।

একই দিন সকালে গুলশান-২ এলাকায় মানববন্ধন করেছে ‘গুলশান সোসাইটি’। সংগঠনের বক্তারা বলেন, আট বছরের একটি শিশুকে এভাবে পিষে ফেলা পুরো সমাজের জন্য একটি কলঙ্কজনক অধ্যায়। বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও আইনের ফাঁকফোকর গলে অপরাধীদের পার পেয়ে যাওয়ার প্রবণতা বন্ধ করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিতের দাবি জানান তারা।

রামিসা হত্যার বিচার, দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আশঙ্কাজনক অবনতি এবং চাঁদাবাজির প্রতিবাদে ঢাকার বাইরেও তীব্র আন্দোলন শুরু হয়েছে। বাদ জুমা খুলনা মহানগরীর নিউমার্কেট বায়তুন নূর মসজিদ চত্বর থেকে একটি বিশাল বিক্ষোভ মিছিল বের করে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির খুলনা মহানগর শাখা। মিছিলটি শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে ময়লাপোতা মোড়ে গিয়ে সমাবেশের মাধ্যমে শেষ হয়।

সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে শিবিরের কেন্দ্রীয় কলেজ কার্যক্রম বিষয়ক সম্পাদক হাফেজ ইউসুফ ইসলাহী প্রশাসনকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “সারাদেশে একের পর এক জঘন্য অপরাধ ঘটছে, অথচ প্রশাসন উদাসীন দর্শকের ভূমিকা পালন করছে। অনতিবিলম্বে জনজীবনে শান্তি ফিরিয়ে আনতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।”