দ্রোহ, ভোট সমীকরণ ও সম্ভাবনার দ্বন্দ্ব বাগেরহাটের চার আসনে বিএনপি চাপে, সুবিধাজনক অবস্থানে জামায়াত

0
দ্রোহ, ভোট সমীকরণ ও সম্ভাবনার দ্বন্দ্ব বাগেরহাটের চার আসনে বিএনপি চাপে, সুবিধাজনক অবস্থানে জামায়াত

বাগেরহাট প্রতিনিধি: ইতিহাস, ঐতিহ্য ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপার সমৃদ্ধিতে গড়া এক জনপদের নাম বাগেরহাট। ষাটগম্বুজ মসজিদের অনন্য স্থাপত্য, খান জাহান আলীর স্মৃতিবিজড়িত পথচলা আর বিশ্বঐতিহ্য সুন্দরবনের সবুজ বেষ্টনী এ জেলাকে দিয়েছে আলাদা পরিচিতি। কাগজে-কলমে বাগেরহাট সম্ভাবনাময় জেলা হলেও বাস্তবতায় এখানকার মানুষ আজও কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত।

স্বাধীনতার পাঁচ দশকের বেশি সময় পার হলেও জেলার সাধারণ মানুষের জীবনমান বদলায়নি প্রত্যাশিত মাত্রায়। সরকার বদলেছে, জনপ্রতিনিধি বদলেছে, প্রতিবারই শোনা গেছে উন্নয়নের আশ্বাস—কিন্তু প্রতিশ্রুতি আর বাস্তবতার ব্যবধান আজও রয়ে গেছে। এমন প্রেক্ষাপটে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে জেলার চারটি আসনেই রাজনৈতিক উত্তাপ চরমে।

এবারের নির্বাচনে বাগেরহাট জেলার চারটি সংসদীয় আসনে মোট ২১ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এর মধ্যে দলীয় প্রার্থী ১৮ জন এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী তিন জন। তবে আলোচনার কেন্দ্রে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও বিদ্রোহী প্রার্থীদের অংশগ্রহণ।

চারটি আসনের প্রতিটিতেই বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী থাকায় চাপে পড়েছে বিএনপি। ভোট ভাগ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় দলের প্রার্থীরা স্বস্তিতে নেই। তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মতে, এই পরিস্থিতিতে সুবিধাজনক অবস্থানে চলে গেছে জামায়াতে ইসলামী।

স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত নাম সাবেক সংসদ সদস্য এম এ এইচ সেলিম। তিনি একযোগে বাগেরহাট-১, বাগেরহাট-২ ও বাগেরহাট-৩—এই তিনটি আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তার এই সিদ্ধান্ত বিএনপির ভোট সমীকরণে বড় ধরনের চাপ তৈরি করেছে।

অন্য দুই বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী হলেন— বাগেরহাট-১ আসনে জেলা বিএনপির সাবেক সহসভাপতি ও জেলা আহ্বায়ক কমিটির সদস্য প্রকৌশলী মো. শেখ মাসুদ রানা, বাগেরহাট-৪ আসনে জেলা বিএনপির সাবেক সহসভাপতি ও বর্তমান আহ্বায়ক কমিটির সদস্য কাজী খাইরুজ্জামান শিপন

কেন্দ্রীয় বিএনপি ইতোমধ্যে শেখ মাসুদ রানা ও কাজী খাইরুজ্জামান শিপনকে দলের প্রাথমিক সদস্যসহ সব পদ থেকে বহিষ্কার করলেও তারা মাঠে সক্রিয়ভাবে গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন।

বাগেরহাট-১ আসন এ আসনে বিএনপির প্রার্থী বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (ভিএইচপি) বাংলাদেশের মহাসচিব ও অশ্বিনী সেবা আশ্রমের সভাপতি কপিল কৃষ্ণ মন্ডল। তার বিপরীতে রয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী এম এ এইচ সেলিম ও প্রকৌশলী মো. শেখ মাসুদ রানা। তাদের সঙ্গে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আছেন জামায়াত প্রার্থী অধ্যক্ষ মাওলানা মো. মশিউর রহমান খান। মোট ভোটার: ৩,৭৫,৫৬০ জন।

বাগেরহাট-২ আসন বিএনপির প্রার্থী সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার শেখ মোহাম্মদ জাকির হোসেন। প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী এম এ এইচ সেলিম ও জামায়াত প্রার্থী শেখ মনজুরুল হক রাহাত। মোট ভোটার: ৩,৩৮,০০৯ জন।

বাগেরহাট-৩ আসন ধানের শীষের প্রার্থী জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও সুন্দরবন সুরক্ষা আন্দোলনের পরিচিত মুখ ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম। এখানে স্বতন্ত্র প্রার্থী এম এ এইচ সেলিম এবং জামায়াত প্রার্থী অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ আব্দুল ওয়াদুদ শেখ শক্ত অবস্থানে রয়েছেন। মোট ভোটার: ২,৬৬,৮৬৪ জন।

বাগেরহাট-৪ আসন বিএনপির নতুন মুখ, ভিএইচপি বাংলাদেশের সাবেক সভাপতি সোমনাথ দে ধানের শীষ প্রতীকে লড়ছেন। তার বিপরীতে স্বতন্ত্র বিদ্রোহী প্রার্থী কাজী খাইরুজ্জামান শিপন এবং জামায়াত প্রার্থী অধ্যক্ষ মো. আব্দুল আলীম। মোট ভোটার: ৩,৮০,৬৭৮ জন।

জেলা বিএনপির সদস্যসচিব মোজাফ্ফর রহমান আলম বলেন, বিদ্রোহী প্রার্থীদের বিষয়টি দলীয় সর্বোচ্চ নেতৃত্বকে অবহিত করা হয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, বিএনপির প্রার্থীদের পরাজিত করতে একটি গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবেই বিদ্রোহী প্রার্থীরা মাঠে রয়েছেন।

তিনি আরও জানান, জেলা বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের দলীয় প্রার্থীদের পক্ষে সমন্বিতভাবে কাজ করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং বিষয়টি প্রতিদিন মনিটরিং করা হচ্ছে।

এক সময় যে বাগেরহাটে বিএনপির জয় সম্ভাবনা উজ্জ্বল মনে করা হচ্ছিল, সেখানে দলীয় কোন্দল ও বিদ্রোহী প্রার্থীদের কারণে পরিস্থিতি এখন অনিশ্চিত। এই সুযোগে মাঠ গুছিয়ে নিচ্ছে জামায়াতে ইসলামী। শেষ পর্যন্ত ভোটের রায় কোন দিকে যায়—সেটিই এখন জেলার রাজনীতির সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।