আজকের ডেস্কঃ দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসন কাটিয়ে দেশে ফেরার পর প্রথম কোনো আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে নিজের রাজনৈতিক দর্শন, আগামীর পরিকল্পনা এবং ভূ-রাজনীতি নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন বিএনপির শীর্ষ নেতা তারেক রহমান। জার্মানিভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলেকে দেওয়া এই সাক্ষাৎকারে তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, আগামীকাল ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি এককভাবেই সরকার গঠনে সক্ষম হবে বলে তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন।
সাক্ষাৎকারের প্রধান দিকগুলো বিস্তারিতভাবে নিচে তুলে ধরা হলো:
নির্বাচন-পরবর্তী জোট বা ‘জাতীয় সরকার’ গঠন নিয়ে ধোঁয়াশা পরিষ্কার করেছেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, “ইনশাআল্লাহ, আমরা কনফিডেন্ট যে বাংলাদেশের মানুষের রায় আমরা পাবো এবং এককভাবে সরকার গঠনে সক্ষম হবো।” জামায়াতে ইসলামীর সাথে ঐক্যের সরকার গঠনের সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়ে তিনি যুক্তি দেন যে, একটি ব্যালেন্সড বা ভারসাম্যপূর্ণ রাষ্ট্র গঠনের জন্য শক্তিশালী বিরোধী দল থাকা প্রয়োজন। সবাই সরকারে চলে আসলে দেশ সঠিকভাবে চলবে না বলে তিনি মন্তব্য করেন।
১৭ বছর পর দেশে ফিরে রাজনৈতিক প্রস্তুতির চেয়েও বড় চ্যালেঞ্জ ছিল ব্যক্তিগত শোক কাটিয়ে ওঠা। তারেক রহমান জানান, নির্বাসন থেকে ফেরার মাত্র পাঁচ দিনের মাথায় তাঁর মা বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যু হয়। একদিকে নির্বাচনের ডামাডোল, অন্যদিকে মায়ের মৃত্যু—এই দুইয়ের সামঞ্জস্য রক্ষা করাই ছিল তাঁর জীবনের অন্যতম কঠিন পরীক্ষা। তিনি বলেন, “আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, এই চ্যালেঞ্জটি আমি মোটামুটিভাবে মোকাবিলা করতে সক্ষম হয়েছি।”
নারীদের নিরাপত্তা ও ক্ষমতায়ন নিয়ে তারেক রহমান একটি দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার কথা জানান। তিনি বলেন:
শিক্ষায় অগ্রাধিকার: মেয়েদের অবৈতনিক শিক্ষা ব্যবস্থা উচ্চতর ক্লাস পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হবে।
ফ্যামিলি কার্ড: প্রান্তিক জনগোষ্ঠী থেকে শুরু করে গৃহিণীদের জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালু করা হবে, যাতে তারা সরাসরি রাষ্ট্রীয় সহায়তা পায়।
নিরাপদ যাতায়াত: বড় শহরগুলোতে নারীদের জন্য বিশেষ ইলেকট্রিক বাস চালু করা হবে, যা নারীরাই পরিচালনা করবেন।
কর্মসংস্থান: ডে-কেয়ার সেন্টার সুবিধাসহ এমন শিল্পকারখানা গড়ে তোলা হবে যেখানে নারী কর্মসংস্থান বেশি হয়।
ভারতের সাথে বিএনপির সম্পর্কের দূরত্ব নিয়ে করা প্রশ্নে তারেক রহমান বলেন, জাতীয় স্বার্থই হবে বিএনপির প্রধান অগ্রাধিকার। “এমন কোনো চুক্তি যদি হয় যা বাংলাদেশের মানুষের স্বার্থের পরিপন্থী, তবে যেকোনো দেশের সাথেই আমাদের দূরত্ব হতে পারে। কারণ আমি আমার দেশের মানুষের প্রতিনিধিত্ব করি।” অন্যদিকে চীনসহ অন্যান্য দেশের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রেও ‘গ্লোবাল ভিলেজ’ ও ‘জাতীয় স্বার্থ’ বজায় রাখার নীতি অনুসরণের কথা জানান তিনি।
বিগত বছরগুলোতে গুম ও খুনের শিকার হওয়া পরিবারগুলোর বিচার নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি বলেন, সভ্য দেশে বিচারহীনতা চলতে পারে না। তবে দলীয় প্রার্থীদের ‘ঋণখেলাপি’ হওয়ার অভিযোগের বিপরীতে তিনি বলেন, রাজনৈতিক হয়রানির কারণে অনেকের ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং তারা পরিকল্পিতভাবে ঋণ পেতে বাধাগ্রস্ত হয়েছেন। দুর্নীতির সাথে একে গুলিয়ে ফেলা ঠিক হবে না।
নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হওয়া নিয়ে আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি প্রসঙ্গে তিনি ৫ই আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের উদাহরণ টেনে বলেন, “মানুষ যাকে গ্রহণ করবে তাকে কেউ ঠেকিয়ে রাখতে পারবে না, আর যাকে বর্জন করবে তাকে কেউ শক্তি দিয়ে ধরে রাখতে পারবে না।”

