‘জনগণের রায়ের সঙ্গে গাদ্দারি করলে কেউ টিকে থাকবে না’: রাজশাহীতে ১১ দলের সমাবেশে ডা. শফিকুর রহমান

0
‘জনগণের রায়ের সঙ্গে গাদ্দারি করলে কেউ টিকে থাকবে না’: রাজশাহীতে ১১ দলের সমাবেশে ডা. শফিকুর রহমান

মাসুদ রানা রাব্বানীঃ গণরায়ের সঠিক বাস্তবায়ন এবং ফারাক্কা চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশের পদ্মাসহ অভিন্ন নদীগুলোর ন্যায্য পানির হিস্যা আদায়ের দাবিতে উত্তাল হয়ে উঠেছে রাজশাহী। শনিবার (১৬ মে) দুপুরে রাজশাহীর ঐতিহাসিক মাদ্রাসা ময়দানে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের উদ্যোগে এক বিশাল বিভাগীয় সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।

সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, ভারত এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বিএনপির তীব্র সমালোচনা করে এক কঠোর বার্তা দিয়েছেন।

রাজশাহীর বিভিন্ন জেলা থেকে আসা হাজার হাজার নেতাকর্মী ও সমর্থকের উপস্থিতিতে কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে ওঠে মাদ্রাসা ময়দান। আন্দোলনের পটভূমি স্মরণ করে জামায়াত আমির বলেন “দেশে রাজনৈতিক পরিবর্তন হঠাৎ করে আসেনি; এর পেছনে রয়েছে বহু মানুষের ত্যাগ ও বুকের তাজা রক্ত। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম ভয়কে জয় করে রাজপথে বুলেট ও গুলির মুখে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছিল বলেই স্বৈরাচারী ও ফ্যাসিবাদী শাসনের পতন সম্ভব হয়েছে।”

তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আজ যারা ক্ষমতায় বসে আছেন, তারা আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি সেই তরুণদের অবমূল্যায়ন করছেন। জনগণের রায় অগ্রাহ্য করলে অতীতের স্বৈরশাসকদের মতো বর্তমান সরকারের পরিণতিও একই হবে বলে তিনি হুঁশিয়ারি দেন।

সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের সমালোচনা করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, নির্বাচনের আগে তারা সংবিধান সংস্কার ও সুশাসনের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, ক্ষমতায় গিয়ে এখন তার উল্টো পথে হাঁটছে।

ইশতেহারের সঙ্গে বেঈমানি: স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় অনির্বাচিত প্রশাসক নিয়োগ দিয়ে সরকার নিজেদের ইশতেহারের সঙ্গেই বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। বিশেষ করে, বিএনপি দলীয় কোটায় ৫২ জেলায় প্রশাসক নিয়োগ দিয়ে নিজেদের প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বেঈমানি করেছে।

সংবিধান সংস্কারে অনীহা: আগে বলা হয়েছিল দেশ মেরামত ও সংবিধান সংস্কারের কথা, আর এখন বলা হচ্ছে সংস্কার তারা বোঝেন না।

প্রশাসনে দলকানা নীতি: বাংলাদেশ ব্যাংক, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে দক্ষ ও যোগ্যদের সরিয়ে অযোগ্য এবং দলকানা লোকদের বসানো হচ্ছে, যার খেসারত জাতিকে দিতে হবে।

দখলবাজি ও চাঁদাবাজি: দেশে এখন সর্বত্র চাঁদাবাজির মহাউৎসব চলছে। মাথা থেকে পায়ের পাতা পর্যন্ত সবাই এতে জড়িত, যার কারণে ক্ষমতাসীনরা এর বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারছে না।

ফারাক্কা ও তিস্তা চুক্তির প্রসঙ্গ টেনে ডা. শফিকুর রহমান প্রতিবেশী দেশ ভারতের উদ্দেশে কড়া বার্তা দেন। তিনি বলেন, “বাংলাদেশ শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে বিশ্বাসী। তবে দেশের দিকে কেউ ‘লাল চোখ’ দেখালে জনগণ তা বরদাশত করবে না। আমাদের শান্তিতে আঘাত করলে কারও শান্তি থাকবে না। এটি তিতুমীর ও হাজী শরীয়তুল্লাহর বাংলাদেশ।”

শুকনো মৌসুমে পদ্মা মরুভূমি এবং বর্ষায় ভয়াবহ বন্যার কথা উল্লেখ করে তিনি তিস্তা মহাপরিকল্পনা ও পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প যেন শুধু লোকদেখানো না হয়ে দ্রুত বাস্তবায়িত হয়, তার জোর দাবি জানান। দেশের ১৫৪টি অভিন্ন নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখার আহ্বান জানিয়ে জামায়াত আমির বলেন, বাংলাদেশ মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সবার। এখানে কোনো সাম্প্রদায়িক অশান্তি সৃষ্টি করতে দেওয়া হবে না। সংসদে জনগণের দাবি আদায়ের সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হবে, তবে সেখানে কথা বলতে না দেওয়া হলে রাজপথেই ‘জনগণের পার্লামেন্ট’ গড়ে তোলা হবে। তিনি ঘোষণা দেন, “জান দেব, কিন্তু দেশের মান দেব না ইনশাল্লাহ।”

জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও উত্তরাঞ্চল পরিচালক মাওলানা রফিকুল ইসলাম খানের সভাপতিত্বে এই ঐতিহাসিক সমাবেশে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রম (চেয়ারম্যান, এলডিপি), অধ্যাপক মুজিবুর রহমান (সিনিয়র নায়েবে আমির, জামায়াত), সারজিস আলম (মুখ্য সংগঠক, এনসিপি-উত্তরাঞ্চল), আল্লামা জালালুদ্দিন আহমদ (মহাসচিব, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস), নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী (মুখ্য সমন্বয়ক, এনসিপি), নুরুল ইসলাম বুলবুল (সংসদ সদস্য ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণ জামায়াতের আমির) সহ জোটের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ।