বাংলাদেশ প্রতিবেদকঃ সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মজলিশে শুরার সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের এক নারীর সঙ্গে অন্তরঙ্গ মুহূর্তের সিসিটিভি ফুটেজ ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। প্রাথমিক অবস্থায় ভিডিওটিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) প্রযুক্তিতে তৈরি ‘ভুয়া’ বলে দাবি করা হলেও, তথ্যযাচাইকারী প্রতিষ্ঠান (ফ্যাক্টচেক) রিউমর স্ক্যানার এটি ‘আসল’ বলে নিশ্চিত করেছে।
ব্যাপক সমালোচনার মুখে মঙ্গলবার (২১ জুলাই) দুপুরে সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম এবং তাঁর দল সাতক্ষীরা জেলা জামায়াত দাবি করেছে, ভিডিওতে দৃশ্যমান নারী এমপি নজরুলের ‘দ্বিতীয় স্ত্রী’। তবে এ ঘটনায় সংসদ সদস্যের দেওয়া ব্ল্যাকমেইল ও জিম্মিদশার বিবরণ নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে সমালোচনার ঝড় বয়ে যাচ্ছে।
মঙ্গলবার দুপুর ১২টার দিকে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে এক দীর্ঘ ব্যাখ্যা দেন গাজী নজরুল ইসলাম। সেখানে তিনি দাবি করেন, গত ১৩ জুলাই ২০২৬ তারিখে তিনি তাঁর প্রথমা স্ত্রী মোছা. মাকছুদা বেগম এবং দ্বিতীয় স্ত্রী মোছা. মরিয়াম বেগমকে সঙ্গে নিয়ে রাজধানীর মগবাজারে শ্বশুরের (দ্বিতীয় স্ত্রীর বাবা) অফিসে যান।
পোস্টে তিনি লেখেন, “আমরা সেখানে অবস্থানকালে জোহরের নামাজের আগে আমার গাড়িচালক এবং দ্বিতীয় স্ত্রীর মামা ওবায়দুল্লাহ বাইরে যায়। পরবর্তীতে ওবায়দুল্লাহ ৫-৭ জন অপরিচিত ব্যক্তিকে নিয়ে কক্ষে প্রবেশ করে আমাদের জিম্মি করে ১ লাখ টাকা আদায় করে। পরে ভাড়াকৃত গাড়িটি আটকে রেখে দফায় দফায় আরও কয়েক লাখ টাকা দাবি করা হয়। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তারা স্বামী-স্ত্রীর ব্যক্তিগত ও ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের সিসিটিভি ভিডিও ধারণ করে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দেয়।”
সংসদ সদস্য নজরুল ইসলাম আরও দাবি করেন, গত ১৭ জুন ২০২৬ তারিখে প্রথম স্ত্রীর সম্মতিতে পারিবারিকভাবে মগবাজারে মরিয়াম বেগমের সঙ্গে তাঁর বিবাহ সম্পন্ন হয়। পারিবারিক ও ব্যবসায়িক শত্রুতাবশত এই ষড়যন্ত্র ও ভিডিও ফাঁস করা হয়েছে বলে উল্লেখ করে তিনি অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
সোমবার (২০ জুলাই) রাতে ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর সাতক্ষীরা জেলা জামায়াতের মিডিয়া সেল থেকে দাবি করা হয়েছিল—এটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে বানানো ভুয়া ভিডিও। তবে সত্যতা যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান রিউমর স্ক্যানার ভিডিওটি আসল বলে প্রতিবেদন প্রকাশের পর অবস্থান বদলায় দলটি।
সাতক্ষীরা জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান মাওলানা আজিজুর রহমান জানান, এমপি নজরুল ইসলাম তাঁদের জানিয়েছেন ভিডিওর নারী তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী এবং প্রথমা স্ত্রীর সম্মতিক্রমেই এই বিয়ে হয়েছে। তবে ভিডিওতে সিসিটিভি ফুটেজের টাইমস্ট্যাম্প ২০২৩ সালের দেখালেও বিয়ে ২০২৬ সালে হয়েছে—এমন গরমিল নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তিনি জানান, সুনির্দিষ্ট তারিখ সংসদ সদস্য নিশ্চিত করতে না পারলেও বিয়েটি যে হয়েছে তা তিনি নিশ্চিত করেছেন।
ঘটনাটি ১৩ জুলাই ঘটলেও এবং লাখ টাকা জিম্মি করে আদায় করা সত্ত্বেও এমপি কেন তাৎক্ষণিক কোনো আইনি বা পুলিশি পদক্ষেপ নেননি—তা নিয়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলে নানা গুঞ্জন তৈরি হয়েছে।
এদিকে, সংসদ সদস্যের ফেসবুক পোস্টে নেটিজেনদের সমালোচনামূলক মন্তব্যের বন্যা বয়ে গেছে:
দিদারুল ইসলাম নিটন নামে একজন লিখেছেন, “এআই বলে চালিয়ে দেওয়াতে সফল না হয়ে এখন দ্বিতীয় বড় গল্প নিয়ে এসেছে! এদের চরিত্র চমৎকার।”
জাহিদুর রহমান মন্তব্য করেছেন, “আপনি এই বুড়া বয়সে ১৮ বছরের আপনার নাতির বয়সী মেয়েকে কীভাবে বিয়ে করেন? জনগণকে ভূগোল না বুঝিয়ে সরাসরি সংবাদ সম্মেলন করে সত্য উপস্থাপন করুন।”
আবু বকর সিদ্দিক লিখেছেন, “দাদু, সব কিছু ম্যানেজ করতে লেইট করে ফেলছেন… সব কিছুর পর দুইটা ফ্যামিলি ম্যানেজ করা তো আর এত সহজ নয়!”
অন্যদিকে বাবু আমদাদ নামে একজন কিছুটা ব্যঙ্গাত্মক সুরেই লিখেছেন, “এমপি সাহেব আপনি টেনশন করিয়েন না… কোনো রকম যদি-কিন্তু ছাড়া আমি আপনার পক্ষে আছি। আর আপনার চয়েস কিন্তু বেশ ভালো!”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, একজন আইনপ্রণেতার ব্যক্তিগত জীবন, সিসিটিভি ফুটেজ ফাঁস এবং তার পরপরই দলের ও তাঁর নিজের বক্তব্য পরিবর্তন রাজনৈতিক অঙ্গনে তাঁর ভাবমূর্তিকে বেশ বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।

