মিরপুরে মায়ের পোকায় ধরা গলিত মরদেহ উদ্ধার: এবার কাঠগড়ায় যুগ্ম-সচিব ছেলে

0
মিরপুরে মায়ের গলিত মরদেহ উদ্ধার: এবার কাঠগড়ায় যুগ্ম-সচিব ছেলে

বাংলাদেশ প্রতিবেদকঃ রাজধানীর মিরপুরে ফ্ল্যাট থেকে বৃদ্ধা মা নুরজাহান বেগমের পচা-গলা ও পোকা ধরা মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় দেশজুড়ে তুমুল আলোড়নের সৃষ্টি হয়েছে। এই অমানবিক ঘটনার প্রেক্ষিতে এবার উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা ও নুরজাহান বেগমের বড় ছেলে যুগ্ম-সচিব এ কে এম আনিসুর রহমানের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে সরকার।

আজ বুধবার (৩ জুন) সকালে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী বিষয়টি নিশ্চিত করে জানিয়েছেন, পুরো ঘটনাটি নিবিড়ভাবে যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে এবং দেশের প্রচলিত আইন ও বিধিমালা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও বুয়েট শিক্ষকের ‘মাতৃবিমুখতা’: বিক্ষুব্ধ জনতা

নিহত নুরজাহান বেগমের সন্তানদের উচ্চ সামাজিক ও পেশাগত অবস্থান জনমনে ক্ষোভের আগুন আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। তার সন্তানদের পরিচয়:

বড় ছেলে এ কে এম আনিসুর রহমান, বিসিএস ক্যাডারের একজন জ্যেষ্ঠ যুগ্ম-সচিব। বর্তমানে তিনি মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (প্রকৌশল ও উন্নয়ন) হিসেবে প্রেষণে কর্মরত। মেজো ছেলে এ কে এম আশিকুর রহমান, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) বিভাগের একজন নামকরা অধ্যাপক। মেয়ে একজন পেশাদার স্কুল শিক্ষিকা।

প্রতিবেশীদের অভিযোগ, এই উচ্চশিক্ষিত সন্তানরা জীবিতাবস্থায় বৃদ্ধা মায়ের কোনো খোঁজখবর নিতেন না। দুই ছেলে আলাদা বিলাসবহুল জীবনযাপন করতেন এবং মায়ের সাথে সব ধরনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে রেখেছিলেন।

যুগ্ম-সচিব আনিসুর রহমানের নৈতিক স্খলন ও আইনি পদক্ষেপের বিষয়ে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী সংবাদমাধ্যমকে বলেন “তাকে (আনিসুর রহমান) গতকাল রাতে ফোনে পাওয়া যায়নি। আমরা আগে নিশ্চিত হতে চাই যে, উদ্ধার হওয়া মরদেহটি তার মায়েরই কি না। আমি ইতিমধ্যে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিষয়টি খতিয়ে দেখার নির্দেশ দিয়েছি।”

বিচারের আশ্বাস দিয়ে প্রতিমন্ত্রী আরও যোগ করেন, “দেশে বাবা-মায়ের ভরণ-পোষণ সংক্রান্ত একটি সুনির্দিষ্ট আইন (পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন, ২০১৩) রয়েছে। সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে তার নৈতিক দায়বদ্ধতার বিষয়টিও আমাদের বিবেচনায় রয়েছে। আইন ও বিভাগীয় বিধিমালা অনুযায়ী যা করণীয়, ঠিক সেটাই করা হবে।”

এদিকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও গত রাত থেকে আজ পর্যন্ত যুগ্ম-সচিব আনিসুর রহমান তার ব্যক্তিগত মুঠোফোনটি রিসিভ করেননি।

গত রোববার (৩১ মে) রাজধানীর মিরপুর-১১ নম্বরের একটি ফ্ল্যাট থেকে তীব্র দুর্গন্ধ ছড়ালে প্রতিবেশীরা জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ‘৯৯৯’-এ কল করেন। পরে পুলিশ এসে ভেতর থেকে নুরজাহান বেগমের পচা-গলা এবং পোকা ধরা বীভৎস মরদেহ উদ্ধার করে।

তদন্তে জানা যায়, বৃদ্ধার স্কুল শিক্ষিকা মেয়ে ওই ফ্ল্যাটেরই পাশের রুমে বসবাস করতেন। কিন্তু মা মারা যাওয়ার পরও তিনি লাশ ঘরে রেখে দিনের পর দিন পার করেছেন, অথচ পুলিশ বা ভাইদের কাউকেই কিছু জানাননি। মায়ের সাথে মানসিক দূরত্ব নাকি অন্য কোনো রহস্য এর পেছনে রয়েছে, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ।

একজন সরকারের উচ্চপদস্থ নীতি-নির্ধারক (যুগ্ম-সচিব) এবং দেশের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপকের মায়ের এমন মর্মান্তিক ও অবহেলিত পরিণতি দেখে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিন্দার ঝড় উঠেছে। সাধারণ মানুষ ও বিশিষ্ট নাগরিকরা বলছেন, শিক্ষার আলো যাদের ভেতরের অন্ধকার দূর করতে পারে না, তাদের কঠোর আইনি শাস্তির মুখোমুখি করাই উচিত।