আন্তর্জাতিক বাঘ দিবস আজ: অবৈধ শিকার থেকে প্রযুক্তির সুরক্ষা, সুন্দরবনে ফিরছে বাঘের গর্জন

0
আন্তর্জাতিক বাঘ দিবস আজ: অবৈধ শিকার থেকে প্রযুক্তির সুরক্ষা, সুন্দরবনে ফিরছে বাঘের গর্জন

বাংলাদেশ প্রতিবেদকঃ এক সময় সুন্দরবনের গহিন অরণ্যে প্রকাশ্যে বাঘ শিকারকে ধরা হতো বীরত্বের প্রতীক হিসেবে। ফলে সচেতনতার অভাব ও অসাধু চোরাশিকারিদের দৌরাত্ম্যে বিলুপ্তির চরম ঝুঁকিতে পড়েছিল ম্যানগ্রোভ বনের এই গর্ব—রয়েল বেঙ্গল টাইগার। তবে যুগের পরিবর্তনের সাথে সাথে কঠোর আইনি পদক্ষেপ, অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং স্থানীয়দের সক্রিয় অংশগ্রহণে চিত্রটি এখন পুরোপুরি বদলে গেছে। ফলে মৃত্যু ও সংঘাত পেরিয়ে বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনে এখন দিন দিন বাড়ছে বাঘের সংখ্যা।

আজ বুধবার দেশজুড়ে নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে পালিত হচ্ছে বিশ্ব বাঘ দিবস। বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাঘ রক্ষা কেবল একটি প্রাণীকে বাঁচিয়ে রাখা নয়, বরং উপকূলীয় সুরক্ষা ও ম্যানগ্রোভের পুরো পরিবেশতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখার মূল চাবিকাঠি।

বন বিভাগের ২০২৪ সালের সর্বশেষ শুমারি অনুযায়ী, সুন্দরবনে বর্তমানে ১২৫টি রয়েল বেঙ্গল টাইগার রয়েছে। ২০১৪ সালে এই সংখ্যা ছিল ১০৬ এবং ২০১৮ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১১৪-তে। প্রতি জরিপেই গড়ে ১০টির মতো বাঘ বৃদ্ধি পাওয়াকে সংরক্ষণ প্রচেষ্টার একটি বড় সাফল্য হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

তবে পেছনের ইতিহাস বেশ করুণ। গত ২৫ বছরে সুন্দরবনে বনদস্যু, চোরাশিকারি, লোকালয়ের হামলা, বার্ধক্য ও প্রাকৃতির দুর্যোগে প্রায় ৬১টি বাঘের মৃত্যুর কথা জানা যায়। তবে অন্য এক হিসাবে পূর্ব সুন্দরবনেই অন্তত ৯১টি বাঘ প্রাণ হারিয়েছে এবং বাঘের হামলায় প্রাণ গেছে ৪২৫ জন বনজীবীর। তবে স্বস্তির বিষয় হলো—স্মার্ট পেট্রোলিং, ক্যামেরা ট্র্যাপ, ড্রোন নজরদারি ও ৩ মাসের জন্য বনে পর্যটন ও বনজীবী প্রবেশে কঠোর নিষেধাজ্ঞার কারণে ২০২৪ সালের পর থেকে সুন্দরবনে বাঘের কোনো অস্বাভাবিক মৃত্যু বা হত্যার ঘটনা ঘটেনি।

চলতি বছরের ৩ জানুয়ারি পূর্ব সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জে শিকারির ফাঁদে আটকে পড়া একটি পূর্ণবয়স্ক বাঘিনীকে উদ্ধার করে বন বিভাগ। দীর্ঘ ছয় মাস নিবিড় চিকিৎসা ও সেবা শেষে গত ১২ জুলাই সেটিকে ফের সুন্দরবনে অবমুক্ত করা হয়। বাঘিনীটির চলাচল মনিটর করতে ৮ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বসানো হয়েছে ২০টি বিশেষ ক্যামেরা ট্র্যাপ, যা বাঘ সংরক্ষণে এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

সম্প্রতি আন্তর্জাতিক বাঘ দিবসের ঠিক প্রাক্কালে সুন্দরবনের আন্ধারমানিক ইকোট্যুরিজম কেন্দ্র ও কচিখালী অভয়ারণ্য এলাকায় খুব কাছ থেকে নদীর জলপথে অবাধে বাঘের সাঁতার কাটার বিরল দৃশ্য দেখা গেছে। এসব দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে এবং বনে স্বাভাবিক পরিবেশে বাঘের বিচরণের প্রমাণ দিচ্ছে।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বিশ্ব বাঘ দিবস উপলক্ষে জাতীয় চিড়িয়াখানায় আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বলেন, “এক শতক আগে পৃথিবীতে প্রায় ১ লাখ বাঘ ছিল, যা এখন কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৫ হাজারে। বাংলাদেশে বর্তমানে সুন্দরবনের ১২৪টির (সর্বশেষ শুমারি অনুযায়ী ১২৫) বাইরেও জাতীয় চিড়িয়াখানায় ১৫টি এবং দেশের অন্যান্য চিড়িয়াখানায় প্রায় ৫০টি বাঘ রয়েছে। বাঘ আমাদের জাতীয় সম্পদ, তাই পরবর্তী প্রজন্মের কথা ভেবে এই প্রজাতি রক্ষা করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।”

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও বাঘ বিশেষজ্ঞ ড. এম. এ. আজিজ মনে করেন, বাঘ বাঁচাতে হলে তাদের প্রধান খাদ্য হরিণ রক্ষা নিশ্চিত করতে হবে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি বিবেচনায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে।

সংরক্ষণবাদীদের মতে, চোরাশিকার সম্পূর্ণ বন্ধ, প্রয়োজনীয় খাদ্যশৃঙ্খল বজায় রাখা এবং সুন্দরবনকে উপদ্রবমুক্ত রাখার মাধ্যমেই কেবল বাঘের নিরাপদ ভবিষ্যৎ তৈরি করা সম্ভব।