
কক্সবাজার প্রতিনিধিঃ পর্যটন নগরী কক্সবাজারকে রুট হিসেবে ব্যবহার করে বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি টাকার ডিজিটাল আর্থিক প্রতারণা চালিয়ে আসছিল এক শক্তিশালী আন্তর্জাতিক সাইবার অপরাধী চক্র। দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর রাজধানীর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে কক্সবাজারের কলাতলী এলাকার ‘হোটেল সি-প্যালেস’-এ এক ঝটিকা অভিযান চালিয়ে এই চক্রের ৬ জন চীনা ও তাইওয়ানিজ সদস্যকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) গভীর রাতে পরিচালিত এ অভিযানে বিপুল পরিমাণ অত্যাধুনিক ডিজিটাল গ্যাজেট ও সরঞ্জাম জব্দ করা হয়।
অভিযান চালিয়ে চক্রটির ব্যবহৃত আস্তানা থেকে পুলিশ চমকপ্রদ সব তথ্য উন্মোচন করেছে। অপরাধ কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য হোটেলের অন্তত ৬টি কক্ষ সম্পূর্ণ সাউন্ডপ্রুফ (শব্দনিরোধক) করে রাখা হয়েছিল। হোটেলের একটি বিশাল হলরুম ও এসব কক্ষ থেকে উদ্ধার করা ইলেকট্রনিক সামগ্রীর মধ্যে রয়েছে ১৯৩৮টি পুরনো মডেলের রূপান্তরিত আইফোন। ৫০টি মনিটর, ৪৪টি সিপিইউ, ৩০টি কীবোর্ড ও ৪০টি মাউস। ৩০টি ল্যাপটপ, ২টি প্রিন্টার, ১টি শক্তিশালী আইপিএস এবং ২৪টি মাল্টিপ্লাগ কানেকশন বোর্ড।
এছাড়া অভিযানে সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য মিলিয়ে চীনা পুলিশের পদমর্যাদা নির্দেশক ‘র্যাঙ্ক ব্যাজ’, চীনের জাতীয় পতাকা এবং দেশটির পুলিশ লোগোযুক্ত বিশেষ টাই উদ্ধারের মাধ্যমে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারণা, পরিচয় গোপন রাখা কিংবা নিজেদের চীনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বা আইনি সংস্থা হিসেবে পরিচয় দিয়ে বিদেশি গ্রাহকদের বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করতে এগুলো ব্যবহার করা হতো।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, এই চক্রটির ব্যাপ্তি কেবল একটি হাসপাতালেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তাদের অন্তত ২০০ থেকে ৩০০ জন চীনা ও তাইওয়ানিজ নাগরিক চক্রাকারে কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভসহ রামু ও উখিয়ার সাগরতীরের বিভিন্ন নির্জন রিসোর্ট এবং হোটেল ভাড়া নিয়ে অবস্থান করছিলেন। চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে ভৌগোলিক সুবিধা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ থেকে বিশ্বব্যাপী অনলাইন জুয়া, অ্যাপভিত্তিক অবৈধ লেনদেন এবং ফিশিং লিংকের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সাইবার ও আর্থিক প্রতারণা পরিচালনা করছিল।
হোটেল সি-প্যালেস কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে যে, অভিযুক্ত বিদেশি দলটি গত ২৬ আগস্ট হোটেলটিতে অতিথি হিসেবে ওঠে।
কক্সবাজার জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) অহিদুর রহমান জানান, সাইবার অপরাধের আন্তর্জাতিক এ নেটওয়ার্ক ধ্বংস করতে রামু থানায় নতুন ‘সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬’-এর ২১, ২২, ২৪ ও ২৭ ধারায় মামলা রুজু করা হয়েছে।
এ মামলায় গ্রেপ্তারকৃত ৬ জন চীনা ও তাইওয়ানিজ নাগরিককে প্রধান আসামির পাশাপাশি আরও চারজনের নাম উল্লেখ করে পলাতক দেখানো হয়েছে। এছাড়া হোটেল ও রিসোর্টে অবস্থানরত ২৫০ থেকে ৩০০ জন অজ্ঞাতনামা চীনা ও তাইওয়ানিজ নাগরিককে মামলার আসামি করা হয়েছে। বিশাল এই গ্যাংয়ের বাকি সদস্যদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে ইতিমধ্যে মেরিন ড্রাইভ এলাকার বিভিন্ন রিসোর্টে গোয়েন্দা নজরদারি ও যৌথ চিরুনি অভিযান শুরু হয়েছে।
