কূটনৈতিক প্রতিবেদকঃ সব নাগরিকদের সমান অধিকার, মর্যাদা ও সম্মান নিশ্চিত করে একটি স্বনির্ভর, সমৃদ্ধ এবং কল্যাণমুখী গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ার সুদৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত ৮১তম সাধারণ পরিষদের সাধারণ বিতর্কে বাংলায় দেওয়া তাঁর প্রথম ভাষণে তিনি দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক রূপরেখা প্রকাশের পাশাপাশি বৈশ্বিক বিভিন্ন সংকটে বাংলাদেশের স্পষ্ট অবস্থান তুলে ধরেন।
ভাষণের শুরুতেই জনগণের ক্ষমতায়নের গুরুত্ব উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “জনগণকে ক্ষমতাহীন রেখে কোনো রাষ্ট্র শক্তিশালী হতে পারে না।” তিনি স্পষ্ট জানান যে, দেশের উন্নয়নকে এগিয়ে নিতে গণতন্ত্র, সুশাসন, মানবাধিকার, জবাবদিহিতা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে বর্তমান সরকার।
পারিবারিক ঐতিহ্যের বিরল রেকর্ড
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে বক্তব্য দেওয়ার মাধ্যমে এক বিরল নজির স্থাপন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। জাতিসংঘের ইতিহাসে এটিই প্রথম ঘটনা যেখানে একই পরিবারের তিন সদস্য—বাবা, মা এবং সন্তান—রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধান হিসেবে সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ভাষণ দিলেন।
এর আগে ১৯৮০ সালের ২৬ আগস্ট সাধারণ পরিষদের ১১তম বিশেষ অধিবেশনে ভাষণে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও দারিদ্র্য দূরীকরণের কথা তুলে ধরেছিলেন তাঁর বাবা সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। পরবর্তীতে ১৯৯৩ থেকে ২০০৫ সালের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর মা খালেদা জিয়া মোট পাঁচবার সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বক্তব্য দেন এবং আরও তিনটি বিশেষ সভায় অংশ নেন। তারেক রহমানের এই ভাষণের মধ্য দিয়ে জাতিসংঘে এই রাজনৈতিক পরিবারের চার দশকের বেশি সময়ের সম্পৃক্ততায় একটি নতুন অধ্যায় যুক্ত হলো।
অর্থনীতি: ‘ভোটের গণতন্ত্রের’ পাশাপাশি ‘অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ন’
দেশের অর্থনীতিতে সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে একগুচ্ছ নতুন উদ্যোগের কথা ঘোষণা করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, সরকার কেবল ‘ভোটের গণতন্ত্র’ নয়, বরং ‘অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ন’ নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর, যাতে প্রবৃদ্ধির সুফল দেশের প্রতিটি পরিবারের ঘরে পৌঁছায়।
স্টার্টআপ ও উদ্ভাবন: তরুণ উদ্যোক্তা ও উদ্ভাবকদের বিকাশে চলতি অর্থবছরে স্টার্টআপ খাতে ৫০ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। দেশকে একটি আন্তর্জাতিক ‘ম্যানুফ্যাকচারিং হাব’-এ পরিণত করার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কাজ চলছে।
নারী ক্ষমতায়ন: নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (SME) খাতে সহজ শর্তে অর্থায়নের সুযোগ বাড়ানো হচ্ছে। এছাড়া স্নাতক পর্যায় পর্যন্ত নারীদের বিনামূল্যে শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিতের কথা তুলে ধরা হয়।
শিক্ষা ও শিশু কল্যাণ: জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দের লক্ষ্য
শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও খেলাধুলাকে অগ্রাধিকার তালিকার শীর্ষে রেখে শিক্ষাখাতে দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দের কথা জানান প্রধানমন্ত্রী।
দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা: আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে ধাপে ধাপে শিক্ষাখাতে বাজেট বাড়িয়ে জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রাথমিক শিক্ষায় উদ্দীপনা: কর্মমুখী ও কারিগরি শিক্ষার পাশাপাশি প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মান বাড়াতে শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে স্কুলব্যাগ, ইউনিফর্ম এবং দুপুরের খাবার দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ক্রীড়াকে পেশা হিসেবে গ্রহণ: জাতীয় শিক্ষাক্রমে ‘স্পোর্টস’ বা খেলাধুলাকে প্রাতিষ্ঠানিক বিষয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। যার সফল দৃষ্টান্ত হিসেবে গত জুনে অনুষ্ঠিত মাসব্যাপী ফুটবল টুর্নামেন্টে ২০ লাখের বেশি শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করে।
জলবায়ু ও পরিবেশ: ২৫ কোটি গাছ ও ২০ হাজার কিমি খাল খনন
জলবায়ু পরিবর্তনের চরম ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশের সুরক্ষায় নিজস্ব উদ্যোগ ও বৈশ্বিক সহায়তার কথা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। আসন্ন কপ-৩১ (COP-31) সম্মেলনে বৈশ্বিক জলবায়ু ন্যায়বিচার ও অর্থায়নের জোর দাবি জানান তিনি।
মেগা পরিবেশ প্রকল্প: আগামী পাঁচ বছরে দেশজুড়ে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর বিশাল কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে।
পানি ও জ্বালানি ব্যবস্থাপনা: বন্যা ও খরা সামাল দিতে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন, সৌর ও পরিচ্ছন্ন জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা’ ও ‘পদ্মা ব্যারাজ’ প্রকল্পের মাধ্যমে পানির সঠিক সুরক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা: ডিজিটাল বৈষম্য দূর করার আহ্বান
বিশ্বের প্রযুক্তিগত বিপ্লবের যুগে প্রবেশ করার প্রসঙ্গ টেনে তারেক রহমান সতর্ক করেন যে, বর্তমান ডিজিটাল বিভাজন যেন ভবিষ্যতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ব্যবহারের ক্ষেত্রে নতুন কোনো বৈষম্যের জন্ম না দেয়। তিনি উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং সাশ্রয়ী মূল্যে প্রযুক্তি পাওয়ার পরিবেশ তৈরিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহযোগিতা কামনা করেন।
রোহিঙ্গা crisis ও ভূ-রাজনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন: বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গার দীর্ঘমেয়াদী উপস্থিতির কারণে দেশের অর্থনীতি, পরিবেশ ও সুরক্ষায় চরম চাপ সৃষ্টি হচ্ছে বলে জানান তিনি। রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধানে মিয়ানমারে তাদের দ্রুত, নিরাপদ ও সম্মানজনক প্রত্যাবাসনের ওপর জোর দেন এবং সাময়িক সময়ে মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান।
এলডিসি উত্তরণ: বাংলাদেশকে স্বল্পোন্নত দেশের (LDC) তালিকা থেকে টেকসইভাবে উত্তরণের জন্য বাজার সুবিধা, নমনীয় অর্থায়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে বৈশ্বিক অংশীদারিত্ব জোরদারের কথা বলেন।
বিশ্ব শান্তি ও ফিলিস্তিন: স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এবং ফিলিস্তিনিদের অধিকারের প্রতি বাংলাদেশের পূর্ণ সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি। পাশাপাশি জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের অবদানের কথা গর্বের সঙ্গে স্মরণ করেন।
জাতিসংঘের এবারের মূল প্রতিপাদ্য—‘রিস্টোরিং ট্রাস্ট, ম্যানেজিং ট্রান্সফরমেশন: অ্যা ইউনাইটেড নেশনস দ্যাট ডেলিভারস ফর অল’—এর প্রতি আস্থা জানিয়ে তারেক রহমান তাঁর বক্তব্য শেষ করেন এক অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশের বার্তা দিয়ে।
তিনি বলেন, তরুণদের স্বপ্ন পূরণ, নারীদের আত্মবিশ্বাস এবং শিশুদের সম্ভাবনা বিকাশের মাধ্যমে একটি নিরাপদ ও শান্তিময় বাংলাদেশ গড়ে তোলাই মূল লক্ষ্য। বক্তব্য শেষে তিনি দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকে স্বাগত জানিয়ে সরকারের মূল মন্ত্র স্মরণ করিয়ে দেন: “সবার আগে বাংলাদেশ: সবার জন্য বাংলাদেশ।”

