পলায়ন, হত্যা ও দুর্নীতি: ৬৩ পুলিশ কর্মকর্তাকে বরখাস্তের প্রক্রিয়া শেষ ধাপে

0
পলায়ন, হত্যা ও দুর্নীতি: ৬৩ পুলিশ কর্মকর্তাকে বরখাস্তের প্রক্রিয়া শেষ ধাপে

বাংলাদেশ প্রতিবেদকঃ কর্মস্থলে অননুমোদিত অনুপস্থিতি, জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে সহিংসতা ও নাশকতা, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং দুর্নীতির দায়ে বাংলাদেশ পুলিশের শীর্ষপর্যায়ের অন্তত ৬৩ জন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে চূড়ান্ত চাকরিচ্যুতির প্রক্রিয়া হাতে নিয়েছে সরকার। অভিযুক্তদের তালিকায় ডিআইজি, অতিরিক্ত ডিআইজি এবং পুলিশ সুপার (এসপি) পদমর্যাদার বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী কর্মকর্তা রয়েছেন।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ অনুযায়ী এসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা পরিচালনা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যেই পিএসসি ও রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ে চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য ১৫টি পৃথক সার-সংক্ষেপ পাঠানো হয়েছে।

২০২৪ সালের ৬ আগস্ট থেকে কর্মস্থলে অনুপস্থিত ও পলাতক থাকা ৩৩ জন কর্মকর্তাকে চাকরি থেকে চূড়ান্তভাবে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে কাজে যোগ দেওয়ার নোটিশ দেওয়া হলেও তারা সাড়া দেননি। পরবর্তীতে কারণ দর্শানোর নোটিশ পাঠানো হলেও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাদের জবাব অসন্তোষজনক বলে আখ্যা দিয়েছে।

অভিযুক্তদের একটি বড় অংশ বিদেশে পালিয়ে গেছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। পলাতক ও বরখাস্তের প্রক্রিয়ায় থাকা উল্লেখযোগ্য কর্মকর্তারা হলেন ডিআইজি ও সমমানের কর্মকর্তা সাবেক ডিআইজি বিপ্লব বিজয় তালুকদার, প্রলয় কুমার জোয়ারদার (পুলিশ অধিদপ্তর), সৈয়দ নুরুল ইসলাম (ঢাকা রেঞ্জ), মো. আনিসুর রহমান (রাজশাহী রেঞ্জ), হাসানুজ্জামান মোল্যা (এপিবিএন), নূরে আলম মিনা (চট্টগ্রাম রেঞ্জ) এবং শ্যামল কুমার মুখার্জী (ট্যুরিস্ট পুলিশ)।

অতিরিক্ত ডিআইজি ও এসপি পদমর্যাদার কর্মকর্তা টুটুল চক্রবর্তী, মোহাম্মদ ফরিদ উদ্দিন, মো. নাজমুল ইসলাম, মো. আবু মারুফ হোসেন (এন্টি টেররিজম ইউনিট), গোলাম মোস্তফা রাসেল (নারায়ণগঞ্জ), হাসান আরাফাত, মো. রহমত উল্লাহ চৌধুরী, এস এম মেহেদী হাসান, মো. তারেক বিন রশিদ এবং জে এম ইমরান (সাবেক জেলা কমান্ড্যান্ট, আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী)।

এর মধ্যে নারায়ণগঞ্জের সাবেক এসপি গোলাম মোস্তফা রাসেলের বরখাস্তের ফাইল চূড়ান্ত স্বাক্ষরের জন্য রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দণ্ডপ্রাপ্ত ও পলাতক রংপুরের সাবেক অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার মো. শাহ নূর আলম পাটওয়ারীর বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা চলছে।

কর্মস্থলে অননুমোদিত অনুপস্থিতি ও পলায়নের অভিযোগ বিভাগীয় তদন্তে প্রমাণিত হওয়ায় ইতোমধ্যে ৬ কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুত করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। তারা হলেন মো. আসাদুজ্জামান (সাবেক এসপি, ঢাকা জেলা), মোহাম্মদ জায়েদুল আলম (অতিরিক্ত ডিআইজি), মোহাম্মদ ছানোয়ার হোসেন (পুলিশ সুপার), আরিফুর রহমান মণ্ডল (সাবেক পুলিশ সুপার), পলাশ রঞ্জন দে (অতিরিক্ত পুলিশ সুপার), রাজীব দাস (অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার)

এছাড়া বগুড়ার সাবেক এসপি সুদীপ কুমার চক্রবর্তীকে ইতোমধ্যেই চাকরিচ্যুত করায় তার বিরুদ্ধে চলা দ্বিতীয় বিভাগীয় মামলার কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে।

পুলিশ সদর দপ্তর জানিয়েছে, পলায়ন ছাড়াও বেশ কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় বেআইনিভাবে গুলি বর্ষণ ও গণহত্যার অভিযোগ রয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এসব মামলার বিচার চলমান থাকায় বেশ কয়েকটি বিভাগীয় কার্যক্রম আপাতত স্থগিত রাখা হয়েছে। ট্রাইব্যুনালের রায়ের পর তাদের বিষয়ে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

ডিএমপির সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ সহ মোট ১৩ জন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ও দুর্নীতিজনিত কারণে বিভাগীয় মামলা বিচারাধীন রয়েছে।

পলায়ন ছাড়াও শৃঙ্খলাভঙ্গ ও নাশকতার অভিযোগে একাধিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। সাময়িক বরখাস্ত থাকা মুহাম্মদ মেহেদী হাসান (সাবেক পরিচালক, ২৪ আনসার ব্যাটালিয়ন), মো. ফখরুল আলম (ময়মনসিংহ রেঞ্জ) এবং সৈয়দ ইফতেহার আলীর (রাজশাহী রেঞ্জ) বিরুদ্ধে নাশকতার অভিযোগে পুনর্ তদন্ত ও বিভাগীয় মামলা চলছে।

ডিএমপির সাবেক ডিআইজি কাজী মনিরুজ্জামান, কক্সবাজারের সাবেক এসপি মুহাম্মদ রহমত উল্লাহ, সাবেক উপ-পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ শিবলী কায়সার এবং ময়মনসিংহ রেঞ্জের এস এম ফজলুল হকের বিরুদ্ধে অসদাচরণ ও দুর্নীতির তদন্ত শেষ পর্যায়ে। শিবলী কায়সারকে বরখাস্তের জন্য পিএসসির পরামর্শ চাওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া ঢাকা হাইওয়ে পুলিশের সাবেক অ্যাডিশনাল ডিআইজি মীর মোদাচ্ছের হোসেন, গাইবান্ধার সাবেক এসপি মো. কামাল হোসেন এবং পুলিশ অধিদপ্তরের অ্যাডিশনাল ডিআইজি মোহাম্মদ জহিরুল ইসলামের বিভাগীয় মামলাও চূড়ান্ত নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চাকরিচ্যুতির পুরো প্রক্রিয়াটি সরকারি বিধিমালা অনুসরণ করে করা হচ্ছে। চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপন জারির আগে সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) মতামত এবং রাষ্ট্রপতির অনুমোদন নেওয়া বাধ্যতামূলক। সব প্রক্রিয়া শেষ করে ধাপে ধাপে অভিযুক্ত সকল কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বরখাস্তের আদেশ জারি করা হবে।