জয়নাল আবেদীন: যাযাবর বেদেদের জীবন, নদীর কোল ঘেঁষে খোলা আকাশের নিচে পলিথিন আর ছেঁড়া কাপড়ের তাঁবু বানিয়ে যাযাবরের মতো জীবন কাটাতে অভ্যস্থ বেদে সম্প্রদায়ের মানুষ। বেদে সম্প্রদায় মানুষ বলে, আমরাও মানুষ, আমরা সবাই মুসলমান, সাধারণ মানুষরা আমাদের খোটা দেয়। তাই এ পেশা ছেড়ে তারা স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে চায়। গত ১বছর আগে মুন্সীগঞ্জের বিক্রমপুর ও ফরিদপুর জেলা থেকে আসা ১শটি বেদে পরিবার অস্থায়ীভাবে আশ্রয় নিয়ে আছে রংপুর জেলার মিঠাপুকুর উপজেলার দমদমা ব্রিজের নিচে অবস্থিত ঘাঘট নদীর তীরে। তারা সাধারণ মানুষের মতো বাঁচতে চায়।
এই সম্প্রদায়ের লোকেরা জীবিকার তাগিদে বছরের অর্ধেক সময়ই নৌকা নিয়ে ছুটে বেড়ায় দেশের নানা প্রান্তরে। সাপ খেলা ও তাবিজ বিক্রিই তাদের আয়ের প্রধান উৎস। এ আয় দিয়ে সংসার চালাতে হয় তাদের তাঁবু টানিয়ে বসবাস করেন বেদে সম্প্রদায়ের মানুষেরা। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার ঘাঘট নদীর তীর। প্রচন্ড শীত কুয়াশাসহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগে এভাবেই খোলা আকাশের নিচে তাঁবু খাটিয়ে ভাসমান বেদেদের বসবাস। অনেকটা অনিরাপদ, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে দিয়েই যুগের পর যুগ চলছে বেদে সম্প্রদায়ের জীবন জীবিকা। মৌলিক অধিকারের অনেক কিছুই অধরা এই সম্প্রদায়ের কাছে। অথচ তারা এই দেশেরই নাগরিক।বেদে পরিবারের একজন পার্থ সর্দার বলেন, আমি সাপ ধরে বিক্রি করি, এটাই আমার পেশা, বিভিন্ন জেলা-উপজেলা ঘুরে এই কাজ করি। আমার পরিবারে ৮ জন সদস্য আছে। ছোট শিশু রয়েছে ২ জন বিভিন্ন জায়গায় থাকার কারণে তাদের পড়াশোনা করাতে পারিনা। আর কোথাও গেলে মানুষ আমাদের ভালো চোখে দেখে না এটাও একটা কারণ। তাই আমি চাই সকলে আমাদের মানুষ ভাবুক।সেখানকার বাসিন্দ শিউলী ও শেফালী বলেন, আমরা কোরবানি ঈদ আসলে এক বছর হবে এখানে অবস্থান করছি। গত বছর আমরা চাউল, ডাল, তেল কম্বলসহ বিভিন্ন সামগ্রী পেয়েছিলাম এবার এখন পর্যন্ত পাতলা কম্বল ছাড়া কিছু পেলামনা। আমরা সকলের কাছে উপহাসের পাত্র। আমরা এভাবে থাকতে চাইনা।
অস্থায়ীভাবে বসবাস করা বেদে সম্প্রদায়ের বাসিন্দা ফুলমতি বেগম বলেন, আমরা ৪ মাস আগে রংপুরে এসেছি, নদীর তীরে ¯্রােতের মত এভাবেই চলছে আমাদের জীবন-জীবিকা। সিংগা লাগাই, পোকা উঠাই ও মাচা কমর টানি। এভাবেই চলতে হয়, খুব কষ্ট আমাদের। বাড়ি নাই ঘর নাই এভাবেই পলিথিন দিয়ে তাঁবু খাটিয়ে থাকি। ছেলে-মেয়েদের পড়াশুনা করাতে পারিনি অনেক কষ্টে আছি ভাই।আরেক অস্থায়ী বেদে পল্লীর বাসিন্দা জোনাকি রানী বলেন, আমরা চাই আমাদের ছেলে-মেয়ে নিরাপদে থাকুক। আমরা যেমন ঘুরে বেড়াই আমরা কি চাই আমাদের শিশুরা এভাবে ঘুরে বেড়াক। আমরা কখনো চাই না। আমাদের শিশুদেরও একটা ভবিষ্যৎ আছে। সারাজীবন এই কাজ করলে কি আমাদের চলবে ভাই। আমরা সরকারের কাছ হতে কামনা করি,
আমাদের ছেলে-মেয়েরা ভাল করে পড়াশুনা করুক এবং আমরা ভালো থাকতে চাই।এদিকে গবেষকরা বলছেন বাংলাদেশের বেদে গোষ্ঠী বা যাযাবর শ্রেণীর যারা আমাদের এই উন্নয়ন কর্মকান্ডের সাথে সম্পৃক্ত হতে পারেনি। এখনো তাদের জীবনমান বঞ্চিত অবহেলিত। এসব সুবিধা বঞ্চিত, অধিকার বঞ্চিত অবহেলিত জনগোষ্ঠীকে আমরা সরকারের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে যদি তাদেরকে সম্পৃক্ত করতে না পারি, তাদেরকে স্থায়ী নিবাস ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে না পারি তাহলে কিন্তু আমাদের পুরো উন্নয়ন কর্মকান্ড প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়বে। রংপুরের সেবক জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মোবাশ্বের হাসান বলেন, এই বেদে জনগোষ্ঠীর জীবন মান উন্নয়নের জন্য নেয়া হচ্ছে নানা পরিকল্পনা। তাদেরকে আমরা উৎসাহিত করার চেষ্টা করছি, এটা একটি চ্যালেঞ্জ। আজকে যদি আমরা তাদেরকে কোনো প্রেশার দেই তাহলে তারা অন্য জায়গায় চলে যাবে। আইনশৃঙ্খলার বিষয়টি আমরা নিশ্চিত করার চেষ্টা করছি।তিনি আরও বলেন, ঝড়ে পরা শিশুসহ শিক্ষার বাইরে যেসব শিশু রয়েছে তাদেরকে নিয়ে কিছু সংগঠন কাজও করছে। কিছু স্কুল আছে তাদের লেখাপড়ার কাজ চালিয়ে নিচ্ছে এবং আমাদের সরকারি প্রতিষ্ঠানতো আছেই। আমরা চেষ্টা করছি।

