মাদারীপুরে জেলা শহরের পাশে আড়িয়াল খাঁ নদে বালু উত্তোলনের চলছে মহা উৎসব

0
মাদারীপুরে জেলা শহরের পাশে আড়িয়াল খাঁ নদে বালু উত্তোলনের চলছে মহা উৎসব

আরিফুর রহমান: মাদারীপুর জেলা শহরের পাশে আড়িয়াল খাঁ নদে প্রকাশ্যে চলছে বালু উত্তোলন। মাঝে মাঝে জেলা ও উপজেলা প্রশাসন মোবাইল কোর্ট করে কিছু শ্রমিক গ্রেফতার দেখিয়ে জেল হাজতে পাঠায়। পেটের দায়ে কাজ করতে এসে শ্রমিকরা জেল খাটলেও মূলহোতারা থেকে যায় ধরা ছোয়ার বাহিরে। শ্রমিকদের আটক করে তৃপ্তির হাসি হেসে প্রশাসনও বলে আমরা বালু উত্তোলন বন্ধে কাজ করছি। মূল হোতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার কথা বললেই মলিন হয়ে যায় হাসি। শুকনো মূখে বলে উঠে মূল হোতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। এই পর্যন্ত শেষ। এরপর আবার শুরু হয় সেই গদবাঁধা অভিযানের নামে প্রহসন। প্রশাসনের এহেন আচারণে শহরজুড়ে গুঞ্জন উঠেছে, মোটা অঙ্কের ব্যবসা করে মূল হোতারা। তার কিছুতো যায় প্রশাসনের কর্তাদের কাছে। তাহলে উদুর পিন্ডি বুদুর ঘারে চাপাতে দোষ কোথায়।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, আড়িয়াল খাঁ ও কুমার নদে সারি দিয়ে বেধে রাখা হয়েছে বল্কগেট জাহাজ। এখান থেকেই জাহাজগুলো আড়িয়াল খাঁ নদে ড্রেজারের কাছে গিয়ে বালু ভরে গন্তব্যে নিয়ে যায়। একটি ভরা হয়ে গেলে আবার আরেকটি বল্কগেট জাহাজ চলে যায় ড্রেজারের কাছে। এভাবেই দিন রাত অবৈধভাবে আড়িয়াল খাঁ নদের বালু তুলে নিয়ে ব্যবসা করছে মাদারীপুরের প্রভাবশালী মহলের একটি চক্র। আওয়ামীলীগ সরকারের পতনের আগে এদের মধ্যে কেউ কেউ আওয়ামী নেতাদের ছত্রছায়ায় এই ব্যবসা করতো। আওয়ামীলীগের নেতারা পলাতক থাকলেও এই মহলটি এখনও সক্রিয় বালু ব্যবসায়।

শুধু কি প্রশাসন নাকি সেই আওয়ামী নেতাদের না অন্য কোন রাজনৈতিক নেতাদের ছত্রছায়ায় তারা এই ব্যবসাটি চালিয়ে যাচ্ছে এমন প্রশ্ন এখন স্থানীয় অনেকের। এই বালু ব্যবসাকে কেন্দ্র করে মাদারীপুরে দুই ভাইসহ ৪ জনকে মসজিদে ঢুকে কুপিয়ে হত্যা করার ঘটনাও ঘটেছে। তারপরও হুশ ফেরেনি মাদারীপুরের প্রশাসনের কর্তাদের। অবৈধভাবে নদী থেকে বালু উত্তোলন বন্ধে কার্যকর কোন পদক্ষেপ নিতে দেখা যায় নি তাদের।

আড়িয়াল খাঁ নদে বালু উত্তোলনের মূল হোতা হিসাবে পারভেজ হাওলাদার, এনামুল হাওলাদার, নয়ন হাওলাদার, মিঠুন লস্কর, শাকিব হাওলাদারসহ বেশ কয়েকজনের নাম শোনা যায়। পারভেজ হাওলাদার বলেন, আমি আগে বালু উত্তোলন করতাম কিন্তু এখন করিনা। কারা বালু উত্তোলন করে তাও জানিনা। মুঠোফোনে শাকিব হাওলাদারের সাথে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, সরকার বদল হয়েছে এখন কারা বালু উত্তোলন করে তা আমার জানা নেই। আমি ২ মাস ধরে বালু উত্তোলন বন্ধ রেখেছি। এই ব্যবসার সাথে কারা জড়িত আছে এ বিষয়ে আমার কোন ধারণা নেই। নয়ন হাওলাদার বলেন, আগে এলআর ফান্ডে মাসিক টাকা দিয়ে বালু উত্তোলন করতাম। বর্তমানে নিষেধ করে দিয়েছে। আমি এখন বালু উত্তোলন করি না। যারা বালু ব্যবসা করতো তারা সবাই এখনও করে বলে আমি জানি।

এনামুল হাওলাদারকে ফোন করা হলে কথা বলতে পারবেন না তিনি অসুস্থ্য বলেন জানান। মিঠুন লস্করের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেও পাওয়া যায় নি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় অনেকে বলেন, আমরা বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে কথা বললে আমাদের বিভিন্ন হুমকি দেয়। এমনকি আমাদের উপর হামলা চালায়। সরকার পরিবর্তন হওয়ার পর মনে করেছিলাম এখন বালু উত্তোলন বন্ধ হবে। কিন্তু হয়েছে উল্টো। আগে গভির রাতে বালু উত্তোলন করতো আর এখন রাত দিন ২৪ ঘন্টা বালু উত্তোলন করা হচ্ছে আড়িয়াল খাঁ নদ থেকে। প্রশাসন যদি কখনও অভিযান চালায় তা আমরা আগে থেকেই বুঝতে পারি। যখন দেখি ড্রেজারগুলো নদী থেকে সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে তখনই বুঝতে পারি প্রশাসনের লোকজন অভিযান চালাবে। প্রশাসন অভিযান চালিয়ে গেলে তারপর আবার তারা বালু তোলা শুরু করে। ড্রেজার ব্যবসায়ীরা আর প্রশাসনের লোকজন এভাবেই চোর পুলিশ খেলে। এই খেলা দেখতে দেখতে আমরা অভ্যস্ত হয়ে গেছি।

মাদারীপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ওয়াদিয়া সাবাব বলেন, আমরা মাঝে মাঝে অভিযান চালাই। অনেককে গ্রেফতার করে মোবাইল কোর্টে সাজা দিয়ে জেল হাজতে পাঠাই। তারপরও বালু উত্তোলন বন্ধ করা যাচ্ছে না। নদীতে যারা বালু উত্তোলন করে আমরা তাদের ধরতে পারি। কিন্তু যারা পেছন থেকে তাদের দিয়ে বালু উত্তোলন করায় তাদের ধরা সম্ভব হচ্ছে না। এ বিষয়ে চাইলে পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করে তদন্ত করে বালু উত্তোলনের মূল হোতাদের আইনের আওতায় নিয়ে আসতে পারে। এছাড়া এ বিষয় বড় ধরণের কোন পদক্ষেপ আমাদের উর্ধ্বতনরা নিতে পারে। পুলিশ সুপার মোহাম্মদ নাঈমুল হাছান বলেন, জমি বা নদী জেলা প্রশাসকের। এ বিষয়ে আমি কোন মন্তব্য করব না।

জেলা প্রশাসক মোছা. ইয়াসমিন আক্তার বলেন, বালু উত্তোলন বন্ধ করার জন্য জেলা প্রশাসন কাজ করছে। মাঝে মাঝেই অভিযান চালিয়ে বালু ব্যবসার সাথে জড়িতোদের ধরে মোবাইল কোর্ট করে জেল হাজতে পাঠানো হচ্ছে। এ অভিযান চলমান আছে। নদী থেকে অবৈধ বালু উত্তোলনের মূল হোতাদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে কিনা প্রশ্ন করলে তিনি তা এড়িয়ে যান।