পীরগাছায় ভিজিএফ কার্ডে ‘প্রশাসক’ ও ‘দলীয়দের’ ভাগাভাগির রেজুলেশন ভাইরাল

0
পীরগাছায় ভিজিএফ কার্ডে 'প্রশাসক' ও ‘দলীয়দের’ ভাগাভাগির রেজুলেশন ভাইরাল

পীরগাছা প্রতিনিধি: রংপুরের পীরগাছা উপজেলায় ভিজিএফ (ভালনারেবল গ্রুপ ফিডিং) কর্মসূচির কার্ড বণ্টন নিয়ে বিতর্ক দেখা দিয়েছে। এরই মধ্যে অন্নদানগর ইউনিয়নে প্রশাসকের স্বাক্ষরিত একটি রেজুলেশনে প্রশাসকের নিজের জন্য ৩ শ ৭৭টি এবং ‘দলীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের’ জন্য ১ হাজার ২শ টি কার্ড বরাদ্দের উল্লেখ রয়েছে। অথচ স্থানীয় শল্লার বিল আশ্রয়ণ কেন্দ্রে বসবাসকারী হতদরিদ্র পরিবারগুলোর জন্য কোন বরাদ্দ রাখা হয়নি। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনা শুরু হয়েছে।

রবিবার (১৫ মার্চ) সকাল ১০টার দিকে কার্ডের দাবিতে ইউনিয়ন পরিষদ ঘেরাও করে বঞ্চিত হতদরিদ্র পরিবারগুলো। এর আগে শনিবার সন্ধ্যায় উপজেলার অন্নদানগর ইউনিয়নের প্রশাসক বিজয় কুমার রায়ের গত ৫ মার্চের স্বাক্ষরিত একটি রেজুলেশনের কপি পাওয়া যায়। রেজুলেশনটির ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় সচেতন মহলে নানা প্রশ্ন উঠেছে।

রেজুলেশনে দেখা যায়, ইউনিয়নের জন্য বরাদ্দকৃত মোট ৪ হাজার ৭ শ ৯৭টি ভিজিএফ কার্ড বিভিন্ন খাতে বণ্টনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ইউনিয়ন প্রশাসকের জন্য ৩ শ ৭৭টি কার্ড এবং ‘দলীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের’ জন্য ১ হাজার ২ শ টি কার্ড বরাদ্দের উল্লেখ রয়েছে।

এছাড়া ওয়ার্ডভিত্তিক বণ্টনের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট সংখ্যা নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে ১ ও ২ নম্বর ওয়ার্ডে ২ শ ৭০টি করে, ৩ নম্বর ওয়ার্ডে ২শ ৭৫টি, ৪ ও ৫ নম্বর ওয়ার্ডে ২শ ৩০টি করে, ৬ নম্বর ওয়ার্ডে ২শ ৯০টি, ৭ ও ৮ নম্বর ওয়ার্ডে ২শ ৭০টি করে এবং ৯ নম্বর ওয়ার্ডে ২শ ৯০টি কার্ড বিতরণের কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে তিনজন সংরক্ষিত মহিলা ইউপি সদস্যের জন্য পৃথকভাবে ২শ ৭৫টি করে কার্ড বরাদ্দের কথাও উল্লেখ রয়েছে।

তবে ভিজিএফ কর্মসূচি মূলত দরিদ্র, অসহায় ও নিম্নআয়ের মানুষের জন্য সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী ইউনিয়ন পর্যায়ে গঠিত কমিটির মাধ্যমে প্রকৃত দরিদ্রদের তালিকা প্রণয়ন করে কার্ড বিতরণের কথা রয়েছে।

উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, উপজেলায় ভিজিএফ কর্মসূচির আওতায় মোট ৪৮ হাজার ৩শ ৯৭টি কার্ডের বিপরীতে ৪৮৩.৯৭০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে কল্যাণী ইউনিয়নে ৪হাজার ৩৬টি, পারুল ইউনিয়নে ৫হাজার ৯শ ৮৬টি, ইটাকুমারী ইউনিয়নে ৪হাজার ৮৬টি, অন্নদানগর ইউনিয়নে ৪হাজার ৭শ ৯৭টি, ছাওলা ইউনিয়নে ৬হাজার ৩শ ৮৬টি, তাম্বুলপুর ইউনিয়নে ৬হাজার ৩শ ৮৬টি, পীরগাছা ইউনিয়নে ৭হাজার ৯৮টি, কৈকুড়ী ইউনিয়নে ৫হাজার ২শ ৮৬টি ও কান্দি ইউনিয়নে ৪হাজার ৩৬টি কার্ড বরাদ্দ করা হয়েছে।

এদিকে বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে, ভিজিএফের মতো দরিদ্র মানুষের জন্য বরাদ্দকৃত সহায়তা কর্মসূচির কার্ড বণ্টনে এ ধরনের সিদ্ধান্ত কীভাবে নেওয়া হলো এবং প্রকৃত উপকারভোগীরা আদৌ সেই সুবিধা পাচ্ছেন কি না।

স্থানীয়দের দাবি, কোনো ব্যক্তি বা ‘দলীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের’ জন্য নির্দিষ্ট কার্ড সংরক্ষণের বিধান সরকারি নীতিমালায় নেই। ফলে এমন রেজুলেশন তৈরি করা হলে তা নীতিমালার সঙ্গে অসামঞ্জস্য হতে পারে বলে তারা মনে করছেন।

কার্ড ভাগ বণ্টনের বিষয়টি প্রকাশ হলে রবিবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে কার্ডের দাবিতে ইউনিয়ন পরিষদ ঘেরাও করে বঞ্চিত হতদরিদ্র পরিবারগুলো। পরে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা আলতাফ হোসেনের আশ্বাসের প্রেক্ষিতে তারা চলে যায়।

খবর পেয়ে স্থানীয় সাংবাদিকরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হলে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন অন্নদানগর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি জিল্লুর রহমান। এ সময় তিনি দৈনিক আমার দেশের পীরগাছা প্রতিনিধি হারুন অর রশিদ বাবুর সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণসহ হুমকি দেন।

রেজুলেশনে উল্লেখিত কার্ড বরাদ্দের বিষয়ে জানতে অন্নদানগর ইউনিয়নের প্রশাসক বিজয় কুমার রায়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘কার মাধ্যমে বিতরণ হল সেটা বিষয় না। তবে সকলে যাতে সঠিকভাবে কার্ড পায় সে লক্ষে কাজ করছি।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পীরগাছা উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) আলতাফ হোসেন বলেন, ‘আমরা ইউনিয়নভিত্তিক বরাদ্দ দিয়ে থাকি। পরে ইউনিয়ন কমিটির মাধ্যমে উপকারভোগীর তালিকা তৈরি করে বিতরণ করা হয়। এ ধরনের কোনো বিষয় আমার জানা নেই।’

এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) দেবাশীষ বসাক বলেন, ‘ভিজিএফ কর্মসূচির চাল অবশ্যই দুস্থ ও দরিদ্র মানুষের মাঝে বিতরণ করতে হবে। এভাবে কোনো ব্যক্তিগত বা অন্য কোনো খাতে ভাগ করার সুযোগ নেই। বিষয়টি জানার পর প্রশাসককে পুনরায় সভা আহ্বান করে নীতিমালা অনুযায়ী উপকারভোগী নির্ধারণ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’