টাঙ্গুয়ার হাওরের জলতলে কান্না, মৎস্য পক্ষের মঞ্চে কি তার প্রতিধ্বনি হবে?

0
টাঙ্গুয়ার হাওরের জলতলে কান্না, মৎস্য পক্ষের মঞ্চে কি তার প্রতিধ্বনি হবে?

আহম্মদ কবির: রূপালি মাছে স্বনির্ভরতার স্বপ্ন যখন মৎস্য পক্ষের মঞ্চে উচ্চারিত হবে,তখন দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজননক্ষেত্র টাঙ্গুয়ার হাওরের জলতলে নিঃশব্দে হারিয়ে যাওয়া রেণু-পোনার কান্না কি পৌঁছাবে সেই মঞ্চে?

আগামী ১৬ আগস্ট থেকে দেশজুড়ে শুরু হতে যাচ্ছে জাতীয় মৎস্য পক্ষ ২০২৬। ব্যানার-ফেস্টুন, আলোচনা সভা,সেমিনার ও নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে উদযাপিত হবে দেশের মৎস্য খাতের সাফল্য, সম্ভাবনা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা। এবারের প্রতিপাদ্য রূপালি মৎস্যে স্বনির্ভর দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ।

মৎস্য খাতের অগ্রগতি উদযাপনের প্রয়োজন অবশ্যই আছে। মাছ দেশের মানুষের খাদ্য ও পুষ্টির গুরুত্বপূর্ণ উৎস।এই খাতের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবন-জীবিকা। মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি, জেলেদের জীবনমান উন্নয়ন এবং দেশের খাদ্যনিরাপত্তায় মৎস্যসম্পদের অবদান অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু মৎস্যসম্পদের ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলতে গেলে শুধু উৎপাদনের পরিসংখ্যান দিয়ে পুরো চিত্র বোঝা যায় না। দেখতে হবে মাছের প্রাকৃতিক জন্মভূমিগুলো কতটা নিরাপদ, প্রজননক্ষেত্রগুলো কতটা সুরক্ষিত এবং আগামী দিনের মাছের উৎসগুলো আমরা কতটা সংরক্ষণ করতে পারছি।সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে অবধারিতভাবেই সামনে আসে সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওর। টাঙ্গুয়ার হাওর কোনো সাধারণ জলাভূমি নয়। এটি বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মিঠাপানির জলাভূমি এবং আন্তর্জাতিক গুরুত্বসম্পন্ন রামসার সাইট। ২০০০ সালের ১০ জুলাই টাঙ্গুয়ার হাওর আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমি হিসেবে রামসার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়।

বিভিন্ন গবেষণায় এই হাওরে শতাধিক প্রজাতির মাছের উপস্থিতির কথা উঠে এসেছে। ২০২২ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় টাঙ্গুয়ার হাওরে ১৪৩ প্রজাতির মাছের তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ টাঙ্গুয়ার হাওর শুধু সুনামগঞ্জের একটি জলাভূমি নয়; এটি বাংলাদেশের দেশীয় মৎস্যসম্পদ ও জীববৈচিত্র্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক ভাণ্ডার। এই হাওরের গুরুত্ব শুধু এখানে কত প্রজাতির মাছ রয়েছে, তার ওপর নির্ভর করে না। বরং এর সবচেয়ে বড় মূল্য হলো—প্রাকৃতিকভাবে মাছের প্রজনন, বেড়ে ওঠা এবং জলজ জীববৈচিত্র্যের স্বাভাবিক জীবনচক্রের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল। একটি মা মাছ যখন ডিম ছাড়ে, তখন সেটি শুধু একটি মাছের অস্তিত্ব নয়; তার সঙ্গে তৈরি হয় ভবিষ্যতের অসংখ্য মাছের সম্ভাবনা। ডিম থেকে রেণু, রেণু থেকে পোনা, পোনা থেকে পূর্ণাঙ্গ মাছ—এই ধারাবাহিক প্রাকৃতিক চক্রই একটি জলাভূমির মৎস্যসম্পদকে টিকিয়ে রাখে। কিন্তু সেই জীবনচক্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপগুলো যদি মানুষের অতিরিক্ত লোভের কাছে বারবার বাধাগ্রস্ত হয়, তাহলে একসময় হাওরের মাছ কমে যাওয়াই স্বাভাবিক। আর টাঙ্গুয়ার হাওরের সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন সেটিই—আমরা কি শুধু আজকের মাছ ধরছি, নাকি একই সঙ্গে আগামী দিনের মাছকেও ধ্বংস করছি?হাওরের বিভিন্ন খাল-বিল ও জলজ উদ্ভিদের আড়ালে ‘চায়না দুয়ারী’সহ ক্ষুদ্র ফাঁসের বিভিন্ন ক্ষতিকর জাল ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। এসব জালের ফাঁস এতটাই ছোট যে বড় মাছের পাশাপাশি ছোট মাছ, রেণু-পোনা ও অন্যান্য জলজ প্রাণীও আটকা পড়তে পারে। ফলে একটি মা মাছের সঙ্গে ধ্বংস হয় তার ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সম্ভাবনাও।

আজ যে রেণু-পোনাটি কয়েক মাস পর বড় হয়ে হাওরের মৎস্যসম্পদ সমৃদ্ধ করতে পারত, সেটি যদি এখনই জালে আটকা পড়ে মারা যায়, তাহলে আগামী মৌসুমে সেই মাছটি কোথা থেকে আসবে?এখানেই একটি ভয়াবহ বাস্তবতা লুকিয়ে আছে—রেণু-পোনা নিধন মানে শুধু ছোট মাছ নিধন নয়; এটি ভবিষ্যতের মাছের সম্ভাবনাকে হত্যা করা। সুনামগঞ্জের অন্য হাওর নিয়েও গবেষণায় ক্ষতিকর মাছ ধরার সরঞ্জাম ও অতিরিক্ত মাছ আহরণের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগজনক তথ্য পাওয়া গেছে। ডেকার হাওর নিয়ে প্রকাশিত একটি গবেষণায় ৫১ প্রজাতির মাছ শনাক্ত হলেও ২১ প্রজাতিকে বিভিন্ন মাত্রায় হুমকির মধ্যে পাওয়া যায়। গবেষণায় মাছ ধরার বিভিন্ন সরঞ্জামের প্রভাব এবং অতিরিক্ত আহরণের কারণে মাছের বৈচিত্র্য ও প্রাপ্যতা কমে যাওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে। গবেষণাটি টাঙ্গুয়ার হাওরের ওপর সরাসরি পরিচালিত নয়, তবে সুনামগঞ্জের হাওরভিত্তিক মৎস্যসম্পদের ওপর অতিরিক্ত আহরণ ও ক্ষতিকর মাছ ধরার পদ্ধতির চাপ সম্পর্কে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা।

টাঙ্গুয়ার হাওরের মৎস্যসম্পদের ওপর আরেকটি নতুন উদ্বেগের নাম প্লাস্টিক দূষণ। হাওরের বিভিন্ন এলাকায় মাছ ধরার কাজে ব্যবহৃত প্লাস্টিকের ফাঁদ ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। এসব ফাঁদ পানিতে হারিয়ে গেলে বা ফেলে রাখা হলে দীর্ঘ সময় পরিবেশে থেকে যেতে পারে। ফলে তা শুধু মাছ ধরার সরঞ্জাম হিসেবে নয়, একসময় জলজ পরিবেশের জন্য প্লাস্টিক বর্জ্য হিসেবেও সমস্যা তৈরি করতে পারে। এর পাশাপাশি টাঙ্গুয়ার হাওরে মাইক্রোপ্লাস্টিক বা অতি ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা নিয়ে গবেষণাও হয়েছে। এ বিষয়ে গবেষণার শিরোনামের বাংলা অর্থ হলো—টাঙ্গুয়ার হাওরে মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ: প্লাবনভূমির প্রতিবেশব্যবস্থা ও স্থানীয় মাছের জন্য একটি সম্ভাব্য হুমকি। মাইক্রোপ্লাস্টিক বলতে সাধারণভাবে পাঁচ মিলিমিটারের কম আকারের ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণাকে বোঝানো হয়। এসব কণা পানিতে ও পলিতে জমতে পারে এবং জলজ প্রাণীর খাদ্যশৃঙ্খলেও প্রবেশের সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। ফলে টাঙ্গুয়ার হাওরের পরিবেশগত সংকট এখন শুধু দৃশ্যমান প্লাস্টিক বর্জ্য বা নিষিদ্ধ জালের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; অদৃশ্য ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণাও ভবিষ্যতের জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বৈদ্যুতিক শক মেশিন ব্যবহারের অভিযোগ।হেমন্তে হাওরের পানি কমে এলে রাতের আঁধারে কোথাও কোথাও ব্যাটারিচালিত বৈদ্যুতিক শক মেশিন দিয়ে মাছ শিকারের অভিযোগ স্থানীয়ভাবে শোনা যায়।

এই পদ্ধতির ভয়াবহতা হলো—এতে নির্দিষ্ট কোনো প্রজাতির মাছ বেছে নেওয়া সম্ভব হয় না। শকের প্রভাবে ছোট-বড় মাছসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণী আক্রান্ত হতে পারে। একজন শিকারির কয়েক ঘণ্টার লাভের জন্য যদি অসংখ্য মা মাছ ও রেণু-পোনা মারা যায়, তাহলে সেই ক্ষতি কি শুধু জরিমানা করে পূরণ করা সম্ভব?যে রেণুটি আজ বেঁচে থাকলে আগামী দিনে একটি পূর্ণাঙ্গ মাছ হতে পারত, সেটির জীবন যদি আজই থেমে যায়, তাহলে আগামী দিনের মৎস্যসম্পদের ঘাটতির দায় নেবে কে? এই জায়গাতেই জাতীয় মৎস্য পক্ষের প্রতিপাদ্যের সঙ্গে বাস্তবতার একটি কঠিন প্রশ্ন তৈরি হয়।একদিকে আমরা বলছি—রূপালি মৎস্যে স্বনির্ভর দেশ।অন্যদিকে দেশের প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজননক্ষেত্রগুলোর ওপর যদি অতিরিক্ত আহরণ, ক্ষতিকর জাল,অবৈধ মাছ শিকার ও দূষণের চাপ বাড়তেই থাকে, তাহলে সেই স্বনির্ভরতা কতটা টেকসই হবে?

মাছের উৎপাদন শুধু পুকুর,ঘের বা খামারের ওপর নির্ভর করে না।নদী,বিল,হাওর ও অন্যান্য প্রাকৃতিক জলাভূমিও দেশের মৎস্যসম্পদের গুরুত্বপূর্ণ উৎস। এসব প্রাকৃতিক জলজ প্রতিবেশ সুস্থ না থাকলে দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় মাছের বৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক মৎস্যসম্পদ টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।

টাঙ্গুয়ার হাওর পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা বা ECA। এর সংরক্ষণে প্রশাসন,আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, আনসার ও স্থানীয় পর্যায়ের বিভিন্ন ব্যবস্থাপনা কাঠামো রয়েছে।বিভিন্ন সময় অভিযান পরিচালিত হয়, নিষিদ্ধ জাল জব্দ ও ধ্বংস করা হয়, মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে জরিমানাও করা হয়।অভিযান নিঃসন্দেহে প্রয়োজন। কিন্তু এখানেই শেষ নয়। বরং প্রশ্ন শুরু হয় অভিযান শেষ হওয়ার পর। একদিন জাল জব্দ হলো, জাল ধ্বংস করা হলো, ছবি উঠল, সংবাদ প্রকাশ হলো—তারপর কয়েক দিন বা সপ্তাহ পর যদি একই এলাকায় আবার একই নিষিদ্ধ জাল দেখা যায়,তাহলে প্রশ্ন উঠবেই—এই অভিযান কি সমস্যার সমাধান করছে, নাকি কেবল সমস্যাটিকে সাময়িকভাবে সরিয়ে দিচ্ছে? হাওর রক্ষায় প্রয়োজন ধারাবাহিক নজরদারি। প্রয়োজন রাতের বিশেষ টহল। প্রয়োজন তথ্যভিত্তিক অভিযান। প্রয়োজন নিষিদ্ধ জালের ব্যবহারকারীর পাশাপাশি সরবরাহকারী ও বিক্রেতাদেরও শনাক্ত করা। প্রয়োজন স্থানীয় পর্যায়ে কার্যকর নজরদারি ব্যবস্থা। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—যারা সংরক্ষণের দায়িত্বে রয়েছেন, তাদের কাজেরও জবাবদিহিতা থাকতে হবে। কোনো দায়িত্বশীল ব্যক্তি বা ব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অনিয়মের অভিযোগ উঠলে সেটি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা জরুরি। অভিযোগ সত্য হলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।কারণ সংরক্ষণ শুধু দায়িত্বের নাম নয়; এটি জবাবদিহিতারও বিষয়।

তাই জাতীয় মৎস্য পক্ষ শুধু উৎসবের সময় নয়, হওয়া উচিত নিজেদের মৎস্যসম্পদ ব্যবস্থাপনা নিয়ে আত্মসমালোচনারও সময়। আমরা কত মাছ উৎপাদন করেছি—তার পাশাপাশি প্রশ্ন করতে হবে, কতগুলো প্রাকৃতিক প্রজননক্ষেত্র রক্ষা করেছি? কতটি মা মাছ নিরাপদে ডিম ছাড়তে পেরেছে? কতটি রেণু-পোনা বেঁচে বড় হওয়ার সুযোগ পেয়েছে? কতটি অভয়াশ্রম বাস্তবে কার্যকর হয়েছে? কতটা কমেছে ক্ষতিকর জালের ব্যবহার? আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—দেশীয় মাছের প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য আমরা কতটা ধরে রাখতে পেরেছি? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর ছাড়া শুধু উৎপাদনের পরিসংখ্যান দিয়ে মৎস্যসম্পদের দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য বিচার করা কঠিন।

টাঙ্গুয়ার হাওরকে রক্ষা করতে হলে এখনই কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে। চায়না দুয়ারীসহ ক্ষুদ্র ফাঁসের ক্ষতিকর জাল এবং অন্যান্য নিষিদ্ধ মাছ ধরার সরঞ্জামের বিরুদ্ধে নিয়মিত ও আকস্মিক অভিযান জোরদার করতে হবে। বিশেষ করে রাতের বেলায় নজরদারি বাড়াতে হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী স্পিডবোট, আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থা এবং প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি কাজে লাগানো যেতে পারে।

বৈদ্যুতিক শক মেশিনের ব্যবহার সম্পূর্ণ বন্ধ করার পাশাপাশি এসব সরঞ্জামের উৎস, সরবরাহ ও বেচাকেনার পথও চিহ্নিত করতে হবে। প্লাস্টিকের ক্ষতিকর মাছ ধরার ফাঁদের ক্ষেত্রেও শুধু হাওর থেকে ফাঁদ তুলে ফেললে হবে না; কোথা থেকে এগুলো আসছে এবং কীভাবে বাজারে পৌঁছাচ্ছে, সেটিও নজরদারির আওতায় আনতে হবে। প্রজনন ও সংরক্ষণ মৌসুমে প্রকৃত জেলেদের পর্যাপ্ত খাদ্যসহায়তা, VGF এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। কারণ জীবিকার বিকল্প না থাকলে শুধু নিষেধাজ্ঞা দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ নিশ্চিত করা কঠিন। অভয়াশ্রমের সীমানা ও বিধিনিষেধও স্পষ্ট করতে হবে। স্থানীয় মানুষকে জানাতে হবে কোথায় মাছ ধরা নিষিদ্ধ, কোন ধরনের জাল নিষিদ্ধ এবং সংরক্ষণের সময়কাল কতদিন। একই সঙ্গে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সংরক্ষণের অংশীদার করতে হবে। কারণ এত বিশাল একটি জলাভূমিকে শুধু সরকারি পাহারা দিয়ে দীর্ঘদিন রক্ষা করা কঠিন; স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ ছাড়া টেকসই সংরক্ষণ সম্ভব নয়।সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—সংরক্ষণকে কাগজের ঘোষণা থেকে মাঠের বাস্তবতায় নিয়ে আসা।

আগামী ১৬ আগস্ট যখন জাতীয় মৎস্য পক্ষের মঞ্চে রূপালি মাছের সাফল্যের গল্প বলা হবে, তখন কি কেউ টাঙ্গুয়ার হাওরের কথা বলবেন? কেউ কি বলবেন সেই মা মাছটির কথা, যে প্রজননের আগেই নিষিদ্ধ জালের ফাঁসে আটকা পড়ে?কেউ কি বলবেন সেই রেণু-পোনাটির কথা,যে বড় হওয়ার আগেই হারিয়ে যায়?কেউ কি প্রশ্ন করবেন—আজকের রেণু-পোনা যদি বাঁচাতে না পারি,তাহলে আগামী দিনের রূপালি মাছের স্বনির্ভরতার গল্প লিখব কী দিয়ে?টাঙ্গুয়ার হাওরের রেণু-পোনার কোনো মাইক নেই, কোনো ব্যানার নেই, কোনো সভা নেই, কোনো দাবি জানানোর ভাষা নেই। তাদের একমাত্র ভাষা জল। তাদের একমাত্র আশ্রয় হাওর। তাদের একমাত্র ভবিষ্যৎ—নিরাপদে জন্ম নেওয়া,বেড়ে ওঠা এবং প্রাকৃতিক জীবনচক্র সম্পন্ন করা। তাই এবারের মৎস্য পক্ষের মঞ্চে শুধু উৎপাদনের সাফল্যের গল্প নয়, শোনা দরকার প্রাকৃতিক মৎস্যসম্পদের সংকটের কথাও। শোনা দরকার টাঙ্গুয়ার হাওরের জলতলের সেই নীরব কান্না।শোনা দরকার প্রকৃত জেলেদের জীবিকার কথা। শোনা দরকার দেশীয় মাছের অস্তিত্ব রক্ষার দাবি। আর শোনা দরকার প্রকৃতির সতর্কবার্তা। কারণ আজ যে রেণুকে আমরা রক্ষা করছি, সেটিই আগামী দিনের মাছ। আজ যে মা মাছকে বাঁচাচ্ছি,সেটিই আগামী প্রজন্মের মৎস্যসম্পদের উৎস। আজ যে হাওরকে রক্ষা করছি, সেটিই আগামী দিনের খাদ্যনিরাপত্তার একটি প্রাকৃতিক ভরসা।তাই জাতীয় মৎস্য পক্ষ শুধু ব্যানার, ফেস্টুন, সভা আর বক্তৃতার আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না থেকে মাঠপর্যায়ে দৃশ্যমান পরিবর্তনের অঙ্গীকার করুক।রেণু-পোনা রক্ষার অঙ্গীকার হোক।মা মাছ রক্ষার অঙ্গীকার হোক।প্রাকৃতিক প্রজননক্ষেত্র রক্ষার অঙ্গীকার হোক।অবৈধ মাছ শিকার বন্ধের অঙ্গীকার হোক।

টাঙ্গুয়ার হাওরের জীববৈচিত্র্য রক্ষার অঙ্গীকার হোক।কারণ রেণু-পোনা বাঁচলে মাছ বাঁচবে।মাছ বাঁচলে হাওর বাঁচবে।হাওর বাঁচলে জেলে বাঁচবে।আর হাওর বাঁচলেই বাঁচবে বাংলাদেশের দেশীয় মৎস্যসম্পদের ভবিষ্যৎ। শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা তাই খুব সহজ, কিন্তু উত্তরটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—টাঙ্গুয়ার হাওরের জলতলে যে কান্না প্রতিদিন জমছে,জাতীয় মৎস্য পক্ষের মঞ্চে কি এবার সত্যিই তার প্রতিধ্বনি হবে?নাকি মঞ্চে চলবে রূপালি মাছের জয়গান, আর হাওরের গভীর জলে নিঃশব্দেই চলতে থাকবে ভবিষ্যতের মাছের মৃত্যুমিছিল?