শেরপুর প্রতিনিধি: সরকারের অগ্রাধিকার ভিত্তিক খাল খনন কর্মসূচির কোনো বরাদ্দ মেলেনি শেরপুরের শ্রীবরদীতে।প্রশাসনের উদাসীনতায় এ উপজেলার বাসিন্দারা প্রকল্পের সুফল থেকে বঞ্চিত হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।পাশাপাশি ঐতিহ্যবাহী ‘জিয়াখাল’ উদ্ধারে এলাকাবাসীর টানা আন্দোলনের পরও অবৈধ দখল মুক্ত করা যায়নি খালের একটি বড় অংশ।এমনকি পানি প্রবাহের জন্য নির্মিত অধিকাংশ সেতু ও কালভার্টের মুখ ভরাট করে ফেলায় সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতায় নাকাল হচ্ছেন পৌরবাসী। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বর্তমান সরকার সারাদেশে অগ্রাধিকার প্রকল্প হিসেবে খালখনন কর্মসূচি বাস্তবায়িত করছে।এর আওতায় বিভিন্ন স্থানে খাল পুনঃখনন করা হলেও প্রশাসনিক উদাসিনতায় শ্রীবরদী উপজেলার কোনো খালকে এই প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।অথচ দীর্ঘদিন ধরে শ্রীবরদী পৌরশহরের শতাধিক বছরেরপুরোনো ‘জিয়াখাল’(খেয়াঘাট) উদ্ধারের দাবিতে আন্দোলন করে আসছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
খাল উদ্ধার আন্দোলনের সংগঠক ও এলাকাবাসী জানান, শ্রীবরদী পৌরশহরের প্রাচীন নাম ছিল শম্ভুগঞ্জ।এই খালকে কেন্দ্র করেই এক সময় গড়ে উঠেছিল মূল বাজারটি।ব্যবসা-বাণিজ্য ও যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম ছিল এই জলপথ।বর্তমান শ্রীবরদী ডাকবাংলো সংলগ্ন স্থানে খালের প্রধান ঘাট ছিল।সেখান থেকে নৌ পথে মালপত্র নিয়ে উত্তরে উজান জলকেশর রায় বিল, খড়িকাটা খাল ও মৃগী খাল হয়ে ব্রহ্মপুত্র নদে গিয়ে পৌঁছাতেন ব্যবসায়ীরা।এইপথে জেলা শহর জামালপুরসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যাতায়াত করা যেত।
খালের একটি শাখা পশ্চিমদিকে কুকড়াবিল হয়ে দশানী নদীতে এবং অপর একটি শাখা কলেজের পেছন দিয়ে তাতিহাটি আইডিয়াল হাইস্কুল ও শ্রীবরদী বাসস্ট্যান্ড হয়ে বয়সা বিলে মিশেছিল।এছাড়া দক্ষিণে শ্রীবরদী কেন্দ্রীয় শ্মশান সংলগ্ন চতলাবিল ও বুচাদহ বিলের সংযোগ স্থলে আরেকটি শাখা ছিল।কিন্তু সময়ের আবর্তে ও অবৈধ দখলদারদের দাপটে সে সব আজ কেবলই ইতিহাস।সেতু গুলো রয়ে গেলেও দুইপাশে ভরাট করে ফেলায় স্বাভাবিক পানি প্রবাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে।
২০০৪সালে গঠিত শ্রীবরদী পৌরসভায় বর্তমানে প্রায় ৫০ হাজার মানুষের বসবাস।তবে অভিযোগ রয়েছে, গত দুইদশকেও এখানে পরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি।উল্টো অপরিকল্পিত ড্রেন বানানোর ফলে বর্ষা মৌসুমে সেই ড্রেনের নোংরা পানি অপসারিত হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে ফসলি জমি ও লোকালয়ে।এতে একরের পর একর জমির কলা গাছসহ আমনধান ও শাকসবজি নষ্ট হচ্ছে।বিশেষ করে খামারিয়াপাড়া মহল্লায় ড্রেনের ময়লা পানি লোকজনের বসত বাড়িতে উপচে পড়ায় জনস্বাস্থ্য চরম হুমকির মুখে পড়েছে।
সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা গেছে, শ্রীবরদী-বকশীগঞ্জ সড়কে জিয়াখালের প্রবেশ মুখে থাকা সেতুটির দুইপাশ ভরাট করে দোকান পাট তৈরি করা হয়েছে।সরকারি কলেজের পেছনের সেতুর দুই পাশে গড়ে উঠেছে বসতবাড়ি।একই সড়কের পুরাতন ইটভাটা সংলগ্ন সেতু, তাতিহাটি আইডিয়াল স্কুল সংলগ্ন সেতু এবং খামারিয়াপাড়া-দহেরপাড় রোডের খোকা চেয়ারম্যান বাড়ির মোড়ের সেতুটির মুখ ভরাট করে ফেলা হয়েছে।এছাড়া শ্রীবরদী বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন ঐতিহ্যবাহী সেতুটির একপাশ ভরাট করে নির্মিত হয়েছে বহুতল ভবন।ডাক বাংলো সংলগ্ন ট্রান্সফরমারের পাশে ব্রীজটি বন্ধ হওয়ায় সামন্য বৃষ্টিতে দৈনিক কাচাবাজারে জমছে পানি। আর শ্মশান সংলগ্ন ছোট ও বড় দুটি সেতুর মুখ আটকে মৎস্য খামার গড়ে তোলায় পানি প্রবাহ বন্ধ হয়ে গেছে।
খামারিয়াপাড়া মহল্লার বাসিন্দা শাহআলী বলেন, “পৌরসভার প্রাণকেন্দ্রে থেকেও সামান্য বৃষ্টিতেই আমাদের ঘরবাড়িতে পানি উঠে যায়।শ্মশান সংলগ্ন দুটি সেতুর মুখ আটকে মাছের খামার করায় উজান এলাকার প্রায় আটটি গ্রামে কৃত্রিম জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে।এতে আমনের বীজতলা ও সবজিখেত পানির নিচে তলিয়ে গেছে।”
তারাকান্দি গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দা মুফতি আলহাজ তাজুল ইসলাম বলেন, “ভৌগোলিক দিক থেকে শ্রীবরদী শহরের চারপাশেই খাল ছিল।ওই খালের পানি দিয়ে কৃষি কাজ হতো, মাছের চাহিদা ও মিটত।এখন খাল ভরাট হওয়ায় সামান্য বৃষ্টিতেই জলজট তৈরি হয়।খালগুলো উদ্ধার করা গেলে শ্রীবরদী হতে পারত একটি সুন্দর ও পরিকল্পিত শহর।সেতুর মুখ ভরাট করে পানি সরার পথ বন্ধের পেছনে প্রশাসনের নীরবতাই দায়ী।”
জিয়াখাল উদ্ধার আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক হারুন অর রশিদ অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, “সারাদেশে খালখনন কর্মসূচি বাস্তবায়িত হলেও শ্রীবরদী কেন বাদ পড়ল, তা খতিয়ে দেখা দরকার।ঐতিহ্যবাহী জিয়াখাল পুনঃখনন, দখলমুক্ত করণ এবং সেতু গুলোর ভরাট মুখ উন্মুক্ত করে পৌরবাসীকে জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি দেওয়ার জোরদাবি জানাচ্ছি।একই সঙ্গে সরকারি এই গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প থেকে শ্রীবরদী বাদ পড়ার কারণ অনুসন্ধান করে সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির আওতায় আনা উচিত।”
এ বিষয়ে জানতে চাইলে শ্রীবরদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও পৌরপ্রশাসক বলেন, “জিয়াখাল উদ্ধারের দাবীতে ভুক্তভোগী এলাকাবাসী কর্তৃক একটি স্বারকলিপি পেয়েছি। খালের জায়গা সরেজমিনে পরিদর্শন করা হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জমির কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। জলবদ্ধতা নিরসনে খালখননের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য কাজ করছি।

