‘আজ পুষ্পপাড়া স্বাধীন’ স্লোগানে রক্তভেজা গরুর হাট: পাবনায় প্রকাশ্যে জোড়া খুনের নেপথ্যে চরমপন্থী ও ইজারা দ্বন্দ্ব

0
‘আজ পুষ্পপাড়া স্বাধীন’ স্লোগানে রক্তভেজা গরুর হাট: পাবনায় প্রকাশ্যে জোড়া খুনের নেপথ্যে চরমপন্থী ও ইজারা দ্বন্দ্ব

পাবনা প্রতিনিধিঃ পাবনার আতাইকুলা থানার ব্যস্ততম পুষ্পপাড়া গরুর হাটে এক রক্তক্ষয়ী ও আতঙ্কজনক তাণ্ডব চালিয়েছে একদল মুখোশধারী অস্ত্রধারী। বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর ২০২৬) সন্ধ্যায় হাটের ইজারাদার কার্যালয়ে অতর্কিত হামলা চালিয়ে প্রকাশ্য দিবালোকে দুজনকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। জোড়া খুনের পর হামলাকারীরা উচ্চস্বরে **‘আজ পুষ্পপাড়া স্বাধীন হয়ে গেল’** বলে স্লোগান দিতে দিতে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে।

হামলাকারীদের এই রহস্যজনক স্লোগান, হত্যাকাণ্ডের নৃশংসতা এবং ইজারা নিয়ে দীর্ঘদিনের সুপ্ত বিরোধ—সব মিলিয়ে পুরো এলাকা এখন এক থমথমে ও আতঙ্কিত জনপদে পরিণত হয়েছে।

ঘটনাস্থলের পাশের এক ব্যবসায়ী সেই ভয়াল মুহূর্তের বর্ণনা দিতে গিয়ে জানান, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা আনুমানিক ৬টা ৪০ মিনিটে ৫ থেকে ৬ জনের একটি সশস্ত্র দল মুখে কালো কাপড় বেঁধে বাজারে প্রবেশ করে। তারা কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই পুষ্পপাড়া গরুর হাটের কার্যালয়ে ঢুকে সরাসরি গুলি চালায়।

কয়েক রাউন্ড গুলি চালিয়ে মুহূর্তের মধ্যে দুজনকে নিশ্চিত মৃত্যু ঘটিয়ে তারা এলাকা ত্যাগ করার সময় বিজয়োল্লাসে স্লোগান দিতে থাকে। নজিরবিহীন এই ঘটনায় মুহূর্তেই পুরো বাজারে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং কেনাবেচা বন্ধ হয়ে যায়।

এই চাঞ্চল্যকর জোড়া খুনে নিহতরা হলেন আব্দুস সালাম (৫৬) কার্যক্রম নিষিদ্ধ পাবনা সদর উপজেলা শ্রমিক লীগের সাবেক আহ্বায়ক এবং গত ৩০ বছর ধরে পুষ্পপাড়া গরুর হাটের ইজারাদার। তবে বিগত রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি স্থানীয়ভাবে জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে জানা গেছে।

রিপন হোসেন (৫০) সালামের আপন ভাগনে। তিনি আতাইকুলা ইউনিয়ন জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি ও সদর উপজেলা বিএনপির সাবেক সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন।

স্বজনদের ভাষ্যমতে, নিহত আব্দুস সালাম একাধারে কোরআনের হাফেজ ও কয়েকবারের হাজী ছিলেন। গরুর হাটের আয়ের একটি বড় অংশ তিনি স্থানীয় মসজিদ ও মাদ্রাসায় দান করতেন।

শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) দুপুরে পুষ্পপাড়া গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, পাবনা-ঢাকা মহাসড়ক সংলগ্ন গরুর হাটের কার্যালয়ের মেঝেতে তখনও জমে আছে তাজা রক্তের দাগ। নিহত সালামের বাড়িতে চলছে স্বজন ও প্রতিবেশীদের কান্নার রোল। লাশ গোসলের জন্য প্রবীণরা বয়ামের পানি ও বরই পাতা প্রস্তুত করছেন। স্থানীয় এক প্রবীণ বাসিন্দা আফসোস করে বলেন, “এমন একজন ভালো মানুষ ও দানশীল লোককে কেন এভাবে মারা হলো, কিছুই মাথায় আসছে না।”

নিহত সালামের ভাই আবুল কালাম আজাদ ওরফে কালো কালাম অভিযোগ করে বলেন, “আমার ভাই ৩০ বছর ধরে এই হাটের ইজারা চালিয়ে আসছেন। হাটের বিপুল অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ও দখল নিতেই পরিকল্পিতভাবে ভাই ও ভাগনেকে হত্যা করা হয়েছে।”

পাবনার পুলিশ সুপার আবু আশ্রাফ জানান, নিহত সালামের পরিবারের সঙ্গে চরমপন্থী যোগাযোগের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট রয়েছে এবং হাটের দীর্ঘদিনের ইজারা নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তীব্র কোন্দল বিদ্যমান। ফলে হাটের দখল-সংক্রান্ত বিরোধ অথবা চরমপন্থীদের অভ্যন্তরীণ কোন্দল—এই দুটি দিককে প্রধান গুরুত্ব দিয়ে পুলিশের একাধিক টিম তদন্তে নেমেছে।

আতাইকুলা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) প্রদীপ কুমার জানান, এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে যাতে নতুন করে কোনো আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি না ঘটে। জড়িতদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের আইনি প্রক্রিয়া জোরদার করা হয়েছে।

পুষ্পপাড়া বাজারে সন্ত্রাসী হামলা এটিই প্রথম নয়। এর আগে ২০১৪ সালের ৩০ মে একই বাজারে প্রকাশ্যে গুলি চালিয়ে ৪ জনকে হত্যা করেছিল দুর্বৃত্তরা। সেই চাঞ্চল্যকর চার খুনের ক্ষত ও রহস্য এখনো পুরোপুরি কাটেনি। এক যুগ পর একই বাজারে আবারও একই কায়দায় জোড়া খুনের ঘটনা ঘটায় স্থানীয়দের মনে পুরনো আতঙ্ক নতুন করে দানা বেঁধেছে।