রিমান্ডের ভয় দেখিয়ে লাখ লাখ টাকা ও আইফোন ঘুষ! সাভারে এসআই নেয়ামতের চাঞ্চল্যকর কাণ্ড

0
রিমান্ডের ভয় দেখিয়ে লাখ লাখ টাকা ও আইফোন ঘুষ! সাভারে এসআই নেয়ামতের চাঞ্চল্যকর কাণ্ড

আদালত প্রতিবেদকঃ সাভারের আলোচিত মাদক ব্যবসায়ী শামীম রেজাকে গ্রেপ্তারের পর রিমান্ডে নির্যাতন না করা এবং নতুন মামলা থেকে বাঁচানোর প্রলোভন দেখিয়ে আসামির স্ত্রীর কাছ থেকে দুটি দামী আইফোন ও লাখ লাখ টাকা ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে সাভার মডেল থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মো. নেয়ামত উল্লাহর বিরুদ্ধে।

শুধু ঘুষ গ্রহণই নয়, অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে রাষ্ট্রপক্ষের গোপনীয় তথ্য ও নথিপত্র পাচার, জব্দকৃত আলামতের নগদ টাকা সরিয়ে ফেলা এবং আসামির স্ত্রীর সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলার মতো একাধিক গুরুতর প্রমাণ।

অনুসন্ধানে জানা যায়, গত ১০ জুন কক্সবাজার থেকে সাভারের মাদক সিন্ডিকেটের মূল হোতা শামীম রেজাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। গ্রেপ্তারের সময় তার কাছে থাকা নগদ ৩ লাখ টাকা আলামত হিসেবে জব্দ করা হলেও তা শুল্ক বা জব্দলিপিতে না দেখিয়ে গায়েব করে ফেলা হয়।

পরবর্তীতে রিমান্ডে শারীরিক নির্যাতন না করার শর্তে এবং নতুন মামলায় না ফাঁসানোর প্রলোভন দিয়ে অভিযুক্ত এসআই নেয়ামত উল্লাহ ও এএসআই লিমন আসামির স্ত্রীর কাছ থেকে প্রায় সাড়ে চার লাখ টাকা মূল্যের দুটি ‘আইফোন ১৭ প্রোক্স ম্যাক্স’ আদায় করেন। এছাড়া ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ‘ম্যানেজ’ করার কথা বলে ধাপে ধাপে আরও প্রায় ৩ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়।

ভুক্তভোগী সুমাইয়া সাথী (আসামির স্ত্রী) জানান, “রিমান্ড এড়ানো ও নতুন মামলায় নাম না দেওয়ার ভয় দেখিয়ে ধাপে ধাপে দুটি আইফোন এবং আমাদের পরিবারের জমানো টাকা ও স্বর্ণালঙ্কার বিক্রি করে লাখ লাখ টাকা ওই এসআইয়ের হাতে তুলে দিতে বাধ্য হয়েছি।”

অনুসন্ধানে প্রাপ্ত একাধিক অডিও ও ভিডিও রেকর্ড থেকে দেখা যায়, এসআই নেয়ামত উল্লাহ মামলার সংবেদনশীল নথিপত্র ও জব্দকৃত আলামতের তথ্য আসামির স্ত্রীর কাছে পাচার করেছেন। এমনকি আসামির স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে নিয়ম ভেঙে কারাগারে গিয়ে আসামির সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ করে দেওয়ার বিষয়টিও ফোনালাপে স্পষ্ট হয়।

এক ফোনালাপে এসআই নেয়ামতকে বলতে শোনা যায়, “আমি তো স্যারদের সঙ্গে সর্বোচ্চটা চেষ্টা করতেছি, সে যেন অন্য কোনো মামলায় না পড়ে।”

অপর এক ভয়েস রেকর্ডে তিনি আক্ষেপ করে বলেন, “আমি আপনাদের কোন কথাটা রাখি নাই? ফোন সাথে সাথে রিসিভ করেছি, অবর্তমানেও খবরাখবর রেখেছি।”

এদিকে অপকর্ম ধামাচাপা দিতে ও সহানুভূতি পেতে এসআই নেয়ামত নিজেকে ‘সৎ’ দাবি করে মসজিদে বসে পবিত্র কুরআন স্পর্শ করে ভিডিও পাঠিয়েছেন বলেও প্রমাণ মিলেছে।

গ্রেপ্তার শামীমের একটি অটো গ্যারেজের চাবি ও জব্দ মালামাল এসআই নেয়ামতের হেফাজতে থাকলেও সেখান থেকে ছয় দফায় প্রায় অর্ধকোটি টাকার মালামাল চুরি হয়ে যায়। এই চুরির নেপথ্যে বহিষ্কৃত এক ছাত্রদল নেতার লোকজনের সম্পৃক্ততার অভিযোগ ওঠে।

ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, লিখিত অভিযোগ দেওয়া হলেও এসআই নেয়ামত অভিযুক্ত ওই ছাত্রদল নেতার পক্ষ নেন। পরবর্তীতে কৌশল বদলে তিনি ওই ছাত্রদল নেতার বিরুদ্ধেই নতুন মামলা করার জন্য আসামির স্ত্রীকে চাপ দিতে থাকেন।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে এসআই মো. নেয়ামত উল্লাহ প্রশ্ন এড়িয়ে যান এবং পরবর্তীতে বিস্তারিত জানাবেন বললেও তাকে আর ফোনে পাওয়া যায়নি।

সাভার মডেল থানার নবাগত অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সাইফুল আলম বলেন, “আমি নতুন যোগদান করেছি, তাই বিষয়টি জানা ছিল না। তবে স্পষ্ট বলতে চাই, কোনো অপরাধী বা মাদক ব্যবসায়ীর সঙ্গে অনৈতিক চুক্তির সুযোগ নেই। প্রমাণের ভিত্তিতে লিখিত অভিযোগ পেলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ তদন্ত সাপেক্ষে তার বিরুদ্ধে কঠোর বিভাগীয় ব্যবস্থা নেবে।”

ঢাকা জজ কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট হরেকৃষ্ণ জানান “পুলিশ প্রবিধান (পিআরবি) অনুযায়ী তদন্তকারী কর্মকর্তা কোনোভাবেই রাষ্ট্রপক্ষের গোপনীয় তথ্য আসামি পক্ষে পাচার করতে পারেন না। আসামির পরিবারের সঙ্গে অনৈতিক যোগাযোগ বা আর্থিক সুবিধা গ্রহণ করা গুরুতর অপরাধ, যার শাস্তি বিভাগীয় বরখাস্ত পর্যন্ত হতে পারে।”

উল্লেখ্য, এসআই নেয়ামত উল্লাহ সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমানের ব্যক্তিগত সহকারী ছিলেন এবং চলতি বছরের ১ ফেব্রুয়ারি সাভার মডেল থানায় যোগ দেন। গত ২২ মে সাভারে মাদক সিন্ডিকেটের সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে ‘দেশ টিভি’ ও ‘এসএ টিভি’র সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। ওই হামলার প্রধান আসামিও ছিলেন এই শামীম রেজা, যাকে গত ১০ জুন কক্সবাজার থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।