শেরপুর প্রতিনিধি: নেই নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি, হয়নি পরীক্ষা। সিন্ডিকেটকে চার লাখ টাকা ঘুসের বিনিময়ে মাস্টাররোলে পেয়েছিলেন সুইপারের চাকরি। তবে চার মাসের মাথায় কাজ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয় তাঁকে। খোয়ানো টাকা ফেরত পেতে জেলা প্রশাসকের (ডিসি) কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়ার পরপরই তৎপর হয়ে ওঠে সংশ্লিষ্ট মহল। রাতেই ডেকে নিয়ে ফেরত দেওয়া হয় আংশিক টাকা, বিনিময়ে নেওয়া হয় অভিযোগ প্রত্যাহারের লিখিতপত্র। তবে ঘুস ফেরত পেলেও নিজের চাকরি আর ফিরে পাননি শেরপুরের শ্রীবরদী উপজেলা পরিষদের পরিচ্ছন্নতাকর্মী মুক্তা হরিজন।
ভুক্তভোগী ও অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, উপজেলা পরিষদের ফেব্রুয়ারি মাসের মাসিক সভার রেজুলেশনের মাধ্যমে পরিচ্ছন্ন কর্মী হিসাবে নিয়োগপ্রাপ্ত হন মুক্তা হরিজন। উপজেলা পরিষদের গাড়ি চালক ও উপজেলা নির্বাহী অফিসারের সিএ ইনসান আলী সিন্ডিকেটকে ৪ লক্ষ টাকার বিনিময়ে চলতি বছরের জানুয়ারিতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার বাংলোতে মাস্টাররোলে সুইপার পদে যোগ দেন মুক্তা হরিজন। গত ফেব্রুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত কাজ করার পর হঠাৎ করেই তাঁর বিরুদ্ধে কাজের গাফিলতির অভিযোগ এনে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা।
মুক্তা হরিজন জানান, চাকরি নিতে গিয়ে স্বর্ণালংকার ও আসবাব বিক্রি করে সিএ ইনসান আলী ও ড্রাইভার রফিকুল ইসলামের হাতে চার লাখ টাকা দিতে হয়েছিল তাঁকে। চাকরিচ্যুত হওয়ার পর সেই টাকা ফেরত পেতে দীর্ঘদিন ঘুরলেও সিএ ইনসান আলী ও ড্রাইভার রফিকুল ইসলাম বিভিন্ন হুমকি ধামকি দিয়ে আসছিলো। বাধ্য হয়ে গত ৬ আগস্ট শেরপুর জেলা প্রশাসক বরাবর একটি লিখিত অভিযোগ দাখিল করেন তিনি। লিখিত অভিযোগ সুত্রে আরও জানা গেছে, একই পদ্ধতিতে মালি পদে আরেকজনকেও নিয়োগ দিয়েছে এ সিন্ডিকেট।
অভিযোগপত্রটি জেলা প্রশাসকের দপ্তরে পৌঁছানোর খবর পেয়েই জরুরি ভিত্তিতে মুক্তা হরিজনকে ডেকে পাঠান অভিযুক্ত সিএ ইনসান আলী ও ড্রাইভার রফিকুল ইসলাম। সেদিন রাতেই ঘুসের চার লাখ টাকার মধ্যে কিছু টাকা ফেরৎ ও বাকি টাকা ফেরতেরর আশ্বাস দেওয়া হয় এবং মুক্তার কাছ থেকে একটি অভিযোগ প্রত্যাহারের আবেদন লিখিয়ে নেওয়া হয়।
ভুক্তভোগী মুক্তা হরিজনের ভাষ্য, “ইউএনও স্যারের বাসায় পরিচ্ছন্নতার কাজের পাশাপাশি সব ধরনের গৃহস্থালি কাজ করিয়ে নেওয়া হতো। প্রতি মাসে চার দিনের ছুটি চাইলে তা দেওয়া হতো না। এর প্রতিবাদ করায় আমাকে কাজ থেকে বাদ দেওয়া হয়। টাকা ফেরত না পেয়ে বাধ্য হয়ে ডিসি স্যারে কাছে লিখিত আবেদন দিয়েছিলাম। আবেদন করার পরই রাতে ডেকে নিয়ে কিছু টাকা ফেরৎ ও বাকি টাকা ফেরত দেয়ার আশ্বাস দিয়ে অভিযোগ তুলে নিতে বলা হয়।” তবে ঘুসের লেনদেনের বিষয়টি অস্বীকার করেছেন অভিযুক্ত সিএ ইনসান আলী। তিনি বলেন, “কাউকে চাকরি দেওয়ার ক্ষমতা আমাদের নেই। ঘুস বা চাকরির বিষয়ে আমি কিছু জানি না। আমার বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হলেও পরে ভুল বুঝতে পেরে মুক্তা হরিজন তা প্রত্যাহার করে নিয়েছেন।” জানতে চাইলে শ্রীবরদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বলেন, “ঘুসের বিনিময়ে চাকরির কোনো বিষয় আমার জানা নেই। বাসভবনে মাস্টাররোলে মুক্তা হরিজনকে অস্থায়ীভাবে রাখা হয়েছিল। ঠিকমতো কাজ না করায় তাঁকে বাদ দেওয়া হয়েছে।”
অনুসন্ধানে জানা গেছে, কোন প্রকার বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ ও পরীক্ষা না নিয়ে শুধুমাত্র উপজেলা পরিষদের মাসিক সভার রেজুলেশনের মাধ্যমে পরিচ্ছন্ন কর্মী পদে মুক্তা হরিজন ও মালি পদে একজনকে অবৈধভাবে নিয়োগ প্রদান করা হয়।
ঘুসের টাকার কিছু ফেরত মিললেও জীবিকা হারিয়ে এখন অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে মুক্তা হরিজনের। স্থানীয়দের মতে, ঘুসের টাকা লেনদেন ও তা তড়িঘড়ি ফেরত দেওয়ার ঘটনাটি নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি রাখে।

