চেক প্রতারণা মামলায় ফাঁদে পড়েছেন? জেনে নিন নিজেকে নির্দোষ প্রমাণের শক্তিশালী আইনি কৌশল

0
চেক প্রতারণা মামলায় ফাঁদে পড়েছেন? জেনে নিন নিজেকে নির্দোষ প্রমাণের শক্তিশালী আইনি কৌশল

সাইফুল আলমঃ হস্তান্তরযোগ্য দলিল আইন বা নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস অ্যাক্ট (NI Act), ১৮৮১-এর ১৩৮ ধারা অনুযায়ী দায়ের করা চেক ডিসঅনার মামলায় অনেক সময় ব্যক্তিগত শত্রুতা বা অযৌক্তিক পাওনা আদায়ের উদ্দেশ্যে কোনো ব্যক্তিকে আসামি করা হয়। আইনের সঠিক ব্যাখ্যা ও কৌশলী ডিফেন্স জানা থাকলে এমন হয়রানি থেকে আত্মরক্ষা করা এবং মামলা থেকে পূর্ণ খালাস পাওয়া সম্ভব।

ব্যক্তির সাথে ব্যক্তির আর্থিক লেনদেন এবং আর্থিক বা ঋণদানকারী প্রতিষ্ঠানের সাথে লেনদেনের ক্ষেত্রে আসামির ডিফেন্স বা আইনি আত্মপক্ষ সমর্থনের কৌশল ভিন্ন হয়। নিম্নে উভয় ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ আইনি আইনি স্ট্র্যাটেজি ও ডিফেন্সসমূহ আলোচনা করা হলো:

ব্যক্তিগত পর্যায়ে দায়ের করা এনআই অ্যাক্টের ১৩৮ ধারার মামলায় আসামি পক্ষ নিম্নোক্ত গুরুত্বপূর্ণ আইনি ডিফেন্সগুলো গ্রহণ করতে পারে:

অসাধু উপায় বা জবরদস্তি: নালিশি চেকটি আসামির কাছ থেকে ভয়ভীতি দেখিয়ে, প্রতারণামূলকভাবে কিংবা কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে গ্রহণ করা হয়েছে।

আইনসম্মত প্রতিদানের অভাব (Absence of Legal Consideration): চেকটি কোনো বৈধ লেনদেন বা পাওনা পরিশোধের (Legally Enforceable Debt) প্রেক্ষিতে হস্তান্তরিত হয়নি।

সিকিউরিটি চেক ও আংশিক পরিশোধ: চেকটি কেবল ‘সিকিউরিটি’ বা জামানত হিসেবে দেওয়া হয়েছিল, আসল পাওনা পরিশোধের জন্য নয়; অথবা দাবিকৃত অর্থ বা তার অংশবিশেষ ইতোমধ্যেই পরিশোধ করা হয়েছে।

হারানো চেক: চেকটি আগেই হারিয়ে গিয়েছিল এবং সেটিকে অসৎ উদ্দেশ্যে ব্যবহার করে ডিসঅনার করানো হয়েছে। মেয়াদ বা তারিখ সংক্রান্ত ত্রুটি: চেকে উল্লেখিত নির্দিষ্ট তারিখের পূর্বেই ব্যাংক থেকে ডিসঅনার করানো হয়েছে।

১৩৮ ধারা অনুযায়ী মামলা প্রক্রিয়ার নির্দিষ্ট সময়সীমা রয়েছে। এসব শর্ত লঙ্ঘন হলে মামলাটি বাতিলযোগ্য হয়:

৩০ দিনের নোটিশ: ব্যাংক থেকে চেক ডিসঅনার হওয়ার পর নির্ধারিত ৩০ দিনের মধ্যে লিগ্যাল নোটিশ না পাঠানো হলে।

নোটিশ প্রাপ্তি ও প্রদেয় সময়: নোটিশ প্রাপ্তির পর টাকা পরিশোধের জন্য আসামিকে পূর্ণ ৩০ দিন সময় দিতে হয়। এর আগেই মামলা দায়ের করা হলে তা ‘ইমমেচিউর’ বা অপক্ব হিসেবে গণ্য হবে।

এ/ডি (Acknowledgment Due) কার্ডের অনুপস্থিতি: রেজিস্টার্ড ডাকে পাঠানো লিগ্যাল নোটিশের সাথে প্রাপ্তিস্বীকার পত্র বা এ/ডি কার্ড না থাকলে আসামি ঠিক কবে নোটিশটি পেয়েছেন তার সঠিক তারিখ নির্ধারণ করা সম্ভব হয় না। ফলে ৩০ দিনের হিসাব অস্পষ্ট থেকে যায়, যা আসামির পক্ষে একটি বড় আইনি সুযোগ তৈরি করে।

তামাদিতে বারিত (Statute of Limitations): নোটিশের ৩০ দিন পার হওয়ার পর এনআই অ্যাক্টের ১৪১(বি) ধারা অনুযায়ী পরবর্তী ১ মাসের মধ্যে মামলা না করলে তা তামাদিতে বারিত হবে।

সংবাদপত্র বিজ্ঞপ্তি: নোটিশ জারির জন্য পত্রিকায় বিজ্ঞাপনের ক্ষেত্রে তা জাতীয় দৈনিক না হয়ে কেবল স্থানীয় পত্রিকায় প্রকাশিত হলে তা আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য নয়।

ব্যাংক বা এনজিওর মতো অর্থলগ্নিকারী প্রতিষ্ঠান যখন কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা করে, তখন সাধারণ ডিফেন্সের বাইরেও কিছু বিশেষ আইনি ধারা প্রযোজ্য হয়:

জামানত হিসেবে জমা: ঋণ গ্রহণের সময় চেকটি কেবল ‘সিকিউরিটি’ বা জামানত স্বরূপ রাখা হয়েছিল, এনআই অ্যাক্টের মূল বিধান অনুযায়ী তা সরাসরি দায় পরিশোধের উদ্দেশ্যে প্রদত্ত নয়। ম্যানেজার বা কর্মকর্তার মামলার এখতিয়ার/কর্তৃত্ব: অনেক সময় প্রতিষ্ঠানের নিজ নামে মামলা না করে কোনো ম্যানেজার বা কর্মকর্তা নিজ নামে মামলা দায়ের করেন। সেক্ষেত্রে আসামি দুটি বড় সুযোগ পান: ১. নালিশি আবেদনটি সঠিকভাবে আইনানুগ পন্থায় করা হয়নি। ২. মামলা দায়েরকারী কর্মকর্তা উপযুক্ত “পাওয়ার অব অ্যাটর্নি” বা আইনি এখতিয়ারপ্রাপ্ত নন।

আইনি নিয়ম: পাওয়ার অব অ্যাটর্নি আইন, ২০১২-এর ২(৭) ধারা এবং স্ট্যাম্প অ্যাক্ট, ১৮৯IX-এর ১ম তফসিলের ৪৮(বি) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী উক্ত পাওয়ার অব অ্যাটর্নি অবশ্যই ১,০০০ টাকার স্ট্যাম্প পেপারে সম্পাদিত ও রেজিস্টার্ড হতে হবে। অন্যথায় কর্মকর্তা আইনগতভাবে মামলা চালাতে পারেন না।

আমাদের দেশের আদালতে সাধারণ ডিফেন্স হিসেবে “মামলা মিথ্যা ও আসামি নির্দোষ” বলা হলেও, বাস্তবে তা একা কোনো সুফল আনে না।

প্রসিকিউশন সাক্ষীকে (P.W.-1) জেরা: উপরে উল্লেখিত প্রতিটি ডিফেন্সের ওপর ভিত্তি করে অভিযোগকারীকে সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন বা জেরা (Cross-examination) করতে হবে এবং ‘সাজেশন’ দিতে হবে।

ডিফেন্স উইটনেস (D.W.): প্রয়োজনে নিজেদের পক্ষে সাফাই সাক্ষী বা ডিডব্লিউ উপস্থাপন করে চেকে উল্লেখিত অসঙ্গতি প্রমাণ করতে হবে।

জামিনের ক্ষেত্রে ভূমিকা: জামিন শুনানির সময় এই সুনির্দিষ্ট আইনি ত্রুটিগুলো (যেমন: নোটিশের সময়সীমা ভঙ্গ বা এডি কার্ড না থাকা) তুলে ধরলে সহজেই আসামির জামিন মঞ্জুর নিশ্চিত করা যায়।

লেখকঃ আইনজীবী
[email protected], 01711942294