
আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে আসা লাখ লাখ ধর্মপ্রাণ মুসলমানের ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইক লা শারিকা লাকা লাব্বাইক’ (আমি হাজির হে আল্লাহ, আমি হাজির, তোমার কোনো শরিক নেই, আমি হাজির) ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে উঠেছে সৌদি আরবের মক্কা ও মিনা প্রান্তর। বিশ্ব মুসলিমের অন্যতম প্রধান মিলনমেলা পবিত্র হজের মূল আনুষ্ঠানিকতা আজ সোমবার (৮ জিলহজ) ‘ইয়াওমুত তারবিয়া’ বা তারবিয়ার দিন পালনের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে।
এ বছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আসা ১৫ লাখেরও বেশি নিবন্ধিত হজযাত্রীর সঙ্গে সৌদি আরবের অভ্যন্তরীণ আরও কয়েক লাখ হাজি মিনার বিশাল ‘তাঁবু নগরী’তে সমবেত হয়েছেন।
রোববার সূর্যাস্তের পর থেকেই হজযাত্রীরা মক্কার নিজ নিজ বাসস্থান থেকে ইহরাম বেঁধে মিনার উদ্দেশে রওনা হতে শুরু করেন। তবে আজ সোমবার ভোর থেকে মিনার পথে মানুষের ঢল নামে। কেউ বাসে, কেউ পায়ে হেঁটে মহান আল্লাহর দরবারে পাপমুক্তির আকুল আকুতি নিয়ে মিনার দিকে অগ্রসর হচ্ছেন। ইসলামের নিয়ম অনুযায়ী, আজ সারাদিন এবং রাত মিনায় অবস্থান করবেন হাজিরা। সেখানে তারা জোহর, আসর, মাগরিব, এশা এবং আগামীকাল মঙ্গলবারের ফজর নামাজ আদায় করবেন ও ইবাদত-বন্দেগিতে মশগুল থাকবেন।
মঙ্গলবার (৯ জিলহজ – ২৬ মে): ফজর নামাজের পর হাজিরা মিনা থেকে হজের সবচেয়ে প্রধান রুকন আদায়ের লক্ষ্যে আরাফাতের ময়দানের উদ্দেশে রওনা হবেন। সেখানে হজের খুতবা শুনবেন এবং জোহর ও আসরের নামাজ একত্রে আদায় করবেন। সূর্যাস্তের পর হাজিরা মুজদালিফার উদ্দেশে যাত্রা করবেন এবং সেখানে খোলা আকাশের নিচে রাত যাপন ও শয়তানকে মারার জন্য পাথর সংগ্রহ করবেন।
বুধবার (১০ জিলহজ – ২৭ মে): সকালে মিনায় ফিরে শয়তানকে বড় পাথর নিক্ষেপ, পশু কোরবানি এবং মাথা মুণ্ডন বা চুল কাটার মধ্য দিয়ে হজের মূল আনুষ্ঠানিকতা শেষ করবেন। একই দিনে মক্কায় পবিত্র কাবা শরিফ তওয়াফ (তাওয়াফে ইফাদাহ) করবেন। এই দিন থেকেই শুরু হবে পবিত্র ঈদুল আজহা।
বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার (১১-১২ জিলহজ): মিনায় অবস্থান করে তিন শয়তানকে পাথর নিক্ষেপ করবেন এবং বিদায়ী তাওয়াফের মাধ্যমে হজের সমাপ্তি টেনে নিজ দেশে ফিরতে শুরু করবেন।
এ বছর হজের দিনগুলোতে মক্কা ও এর আশপাশের এলাকায় প্রচণ্ড ও অসহনীয় গরমের সতর্কতা জারি করেছে সৌদি আবহাওয়া কর্তৃপক্ষ। তাপমাত্রা ৪৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। এই তীব্র তাপপ্রবাহের হাত থেকে হাজিদের রক্ষা করতে এবং হিট স্ট্রোকসহ নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়াতে সৌদি সরকার এবার নজিরবিহীন ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে:
মিনা ও আরাফাতের ময়দানের সংযোগ সড়কগুলোতে উন্নত কুলিং ফ্যান এবং বাতাস ঠান্ডা করার বিশেষ স্প্রে প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। এছাড়া হাজিদের পানি ও ওরাল স্যালাইন বিতরণের জন্য স্বয়ংক্রিয় ‘স্মার্ট রোবট’ মোতায়েন করা হয়েছে।
মক্কার প্রধান প্রধান হাঁটার পথগুলোতে বিশেষ ধরনের তাপ-প্রতিরোধী সাদা কোটিং এবং ছাতার ব্যবস্থা করা হয়েছে যাতে মেঝে অতিরিক্ত গরম না হয়।
হিট স্ট্রোকে আক্রান্ত রোগীদের তাৎক্ষণিক চিকিৎসার জন্য মিনা ও মক্কায় কয়েকশ শয্যার বিশেষায়িত আইসিইউ এবং হাজার হাজার চিকিৎসাকর্মী প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
যাত্রীদের যাতায়াত ও ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়া দ্রুত করতে এবার আধুনিক প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহার করা হচ্ছে। ‘মক্কা রুট ইনিশিয়েটিভ’-এর আওতায় বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের প্রায় ৩০ শতাংশ হজযাত্রী নিজ দেশ থেকেই সৌদি আরবের ইমিগ্রেশন সম্পন্ন করে এসেছেন, যার ফলে জেদ্দা বা মদিনা বিমানবন্দরে তাদের কোনো ভোগান্তি পোহাতে হয়নি।
এছাড়া এবার শতভাগ হাজির জন্য ‘নুসুক’ (Nusuk) ডিজিটাল স্মার্ট কার্ড বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এই কার্ডের মাধ্যমে হাজিদের তাঁবু নম্বর, যাতায়াতের বাস এবং চিকিৎসকের তথ্য এক ক্লিকেই পাওয়া যাচ্ছে। হজের সার্বিক নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে পবিত্র স্থানগুলোতে মোতায়েন করা হয়েছে দশ সহস্রাধিক নিরাপত্তা কর্মী ও স্বেচ্ছাসেবক।
