
আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ যুক্তরাষ্ট্রের ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির নজিরবিহীন ভরাডুবি এবং কংগ্রেসের উভয় কক্ষে ডেমোক্র্যাটদের নিরঙ্কুশ জয়ের পেছনে মূল অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে ‘ইরান যুদ্ধ’। মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উত্তেজনার জেরে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং মার্কিন পেট্রোল পাম্পগুলোতে সাধারণ মানুষের পকেট কাটার দায়েই ভোটাররা ব্যালটের মাধ্যমে ট্রাম্প প্রশাসনকে কঠোর শাস্তি দিয়েছেন—স্বয়ং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই নির্মম সত্য স্বীকার করেছেন।
মহামারী বা অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক মন্দার বাইরে একটি সামরিক সংঘাতের নেতিবাচক প্রভাব কীভাবে সরাসরি হোয়াইট হাউসের রাজনৈতিক সমীকরণ ওলটপালট করে দিতে পারে, এবারের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচন তার এক জ্বলন্ত ও ঐতিহাসিক উদাহরণ হয়ে রইল।
ট্রাম্পের মুখেই ইরান যুদ্ধের খেসারতের স্বীকারোক্তি
নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর প্রভাবশালী মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল ও ফক্স নিউজ-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ডোনাল্ড ট্রাম্প খোলামেলা স্বীকার করেছেন যে, রিপাবলিকানদের এই বিপর্যয়ের পেছনে তেহরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতের প্রত্যক্ষ ভূমিকা রয়েছে।
ট্রাম্প বলেন, “ইরান যুদ্ধের বিষয়টি নির্বাচনে বড় একটি প্রভাব রেখেছে। মানুষ সম্ভবত জ্বালানির দামের এই স্বল্পমেয়াদি ধাক্কা ও মূল্যবৃদ্ধি কোনোভাবেই মেনে নিতে প্রস্তুত ছিল না।”
যদিও ভোটের বাক্সে এর চড়া মূল্য দিতে হয়েছে, তবুও নিজের সিদ্ধান্তকে ‘ঐতিহাসিক ও সঠিক’ বলে দাবি করে ট্রাম্প জানান, তিনি এই পরিণতির কথা জেনেই সামরিক পদক্ষেপে অনড় ছিলেন। তবে সাধারণ ভোক্তাদের ওপর জ্বালানি খরচের আকাশছোঁয়া চাপ যে রিপাবলিকান প্রার্থীদের জয়ের পথ রুদ্ধ করেছে, তা একরকম স্পষ্ট।
ইরানের সঙ্গে সংঘাত এবং কৌশলগত হরমুজ প্রণালীতে চলা দীর্ঘস্থায়ী উত্তেজনার সরাসরি প্রভাব পড়েছিল বিশ্ব অর্থনীতির মূল রক্তনালী—তেল সরবরাহের ওপর।
আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম এক লাফে ব্যারেলপ্রতি রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছায়। এর ফলশ্রুতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে সাধারণ গাড়িচালকদের গ্যালনপ্রতি পেট্রোল ও ডিজেল কিনতে গিয়ে রেকর্ড অর্থ গুণতে হয়।
জীবনযাত্রার ব্যয় ও মূল্যস্ফীতির এই আগুনে ক্ষুব্ধ সাধারণ ভোটাররা বিকল্প হিসেবে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীদের বেছে নেন, যাকে বিশ্লেষকরা অভিহিত করেছেন ট্রাম্পের এজেন্ডার বিরুদ্ধে একটি ‘শক্তিশালী গণরায়’ হিসেবে।
ইরান যুদ্ধের এই চড়া মূল্যের জেরে মার্কিন কংগ্রেসে রিপাবলিকানরা তাদের একক আধিপত্য পুরোপুরি হারিয়েছে ১০০ আসনের উচ্চকক্ষ সিনেটে ডেমোক্র্যাটরা জিতেছে জাদুকরি ৫১টি আসন, যেখানে রিপাবলিকানরা আটকে গেছে মোটে ৪০টিতে। নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদেও বড় ব্যবধানে জয় পেয়ে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে ডেমোক্র্যাটরা।
কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ বিরোধীদের হাতে চলে যাওয়ায় ট্রাম্প প্রশাসনের বাকি দুই বছরের মেয়াদ মারাত্মক আইনি ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। এক প্রতিক্রিয়ায় ট্রাম্প জানিয়েছেন, তিনি সংঘাত এড়াতে ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে সমঝোতায় যেতে চান; তবে একই সঙ্গে হুংকার দিয়ে রেখেছেন—ডেমোক্র্যাটরা কোনো ‘চরমপন্থী বা অযৌক্তিক বিল’ পাসের চেষ্টা করলে তিনি তার শেষ অস্ত্র হিসেবে প্রেসিডেন্টের ‘ভেটো ক্ষমতা (VETO)’ প্রয়োগ করে তা আটকে দিতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করবেন না।
ইরান যুদ্ধের মধ্য দিয়ে যে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতার সূচনা হয়েছিল, মধ্যবর্তী নির্বাচনের ব্যালট পেপারে তার যে চূড়ান্ত মাশুল দিতে হলো রিপাবলিকানদের, তা ওয়াশিংটনের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন আলোচিত হবে।
