ওসমান গনি: বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ। পিঠা উৎসব, বৈশাখী মেলা কিংবা নবান্ন, সবই আমাদের সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।
তবে এই সব উৎসবের ভিড়ে একটি উৎসব আমাদের কাছে কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং তা আমাদের অস্তিত্বের শিকড়কে স্পর্শ করে। সেই উৎসবটি হলো অমর একুশে বইমেলা। প্রতিবছর ফেব্রুয়ারি মাস এলেই বাংলা একাডেমি আর সোহরাওয়ার্দী উদ্যান মুখরিত হয়ে ওঠে লেখক, পাঠক আর প্রকাশকদের পদচারণায়। এটি কেবল বই কেনাবেচার কোনো সাধারণ বাজার নয়, বরং এটি আমাদের ভাষা আন্দোলনের অবিনাশী চেতনা আর হাজার বছরের সংস্কৃতির এক জীবন্ত দর্পণ। এ বছর নানা প্রতিকূলতা আর অনিবার্য সমস্যার কারণে বইমেলা কিছুটা বিলম্বে শুরু হলেও, পাঠকদের অপেক্ষা আর প্রাণের টানে কোনো কমতি ছিল না। বরং দেরিতে শুরু হওয়া মেলাটি যেন আরও বেশি আগ্রহ আর উদ্দীপনা নিয়ে হাজির হয়েছে আমাদের মাঝে।
মেলা প্রাঙ্গণে পা রাখলেই বোঝা যায়, বইয়ের প্রতি মানুষের টান কখনো ফুরিয়ে যাওয়ার নয়। শহরের যান্ত্রিক কোলাহল আর ইট-পাথরের খাঁচায় যখন আমাদের প্রাণ ওষ্ঠাগত, ঠিক তখনই ক্যালেন্ডারের পাতায় ফাল্গুনের আগাম বার্তা নিয়ে আসে অমর একুশে বইমেলা। এটি কেবল স্টল ভর্তি বইয়ের সমাহার নয়, বরং একুশের রক্তস্নাত ইতিহাস থেকে উঠে আসা বাঙালির এক বার্ষিক পুনর্জন্ম। যেখানে ধুলোবালিমাখা মেলাপ্রাঙ্গণ হয়ে ওঠে আমাদের সংস্কৃতির পবিত্র তীর্থভূমি।
আমাদের এই প্রিয় বইমেলার ইতিহাস রক্তের অক্ষরে লেখা। ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষায় যে তরুণরা রাজপথে বুক পেতে দিয়েছিলেন, তাঁদের সেই আত্মত্যাগই আজ বইমেলার মূল ভিত্তি। ভাষার জন্য প্রাণ দেওয়ার ইতিহাস পৃথিবীতে বিরল, আর সেই স্মৃতিকে কেন্দ্র করে মাসব্যাপী বইমেলা আয়োজন করাও এক অনন্য উদাহরণ। ১৯৭২ সালের ৮ই ফেব্রুয়ারি চিত্তরঞ্জন সাহা যখন বাংলা একাডেমির সামনে চটের ওপর মাত্র ৩২টি বই সাজিয়ে বসেছিলেন, তখন হয়তো কেউ ভাবেনি এই ক্ষুদ্র প্রয়াসটিই একদিন বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘ মেলায় পরিণত হবে। আজ সেই ৩২টি বইয়ের মিছিল হাজার হাজার নতুন বইয়ের জোয়ারে রূপ নিয়েছে। বইমেলা এখন কেবল একটি মেলা নয়, এটি প্রতিটি বাঙালির মিলনমেলা।
এখানে দল-মত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই এক হয় কেবল অক্ষরের টানে, শব্দের টানে। নতুন বইয়ের ঘ্রাণে মাতোয়ারা হয়ে শিশু থেকে বৃদ্ধ—সবাই খুঁজে নেয় নিজের পছন্দের জগতকে। এই মেলা আমাদের মনে করিয়ে দেয় আমরা একটি লড়াকু জাতি, যাদের সংস্কৃতির ভিত্তি অনেক মজুত। বইমেলা আমাদের জাতীয় জীবনে মননশীলতার বাতিঘর হিসেবে কাজ করে। আজকের এই দ্রুতগতির ডিজিটাল যুগে, যখন আমাদের চারপাশটা স্মার্টফোন, সোশ্যাল মিডিয়া আর যান্ত্রিকতায় বন্দি, তখন একটি ছাপানো বইয়ের পাতা উল্টানোর আনন্দ যে কতখানি, তা মেলায় না এলে বোঝা যায় না।
প্রযুক্তির দাপটে অনেকেই আশঙ্কা করেছিলেন যে বই হয়তো তার জৌলুস হারাবে এবং মানুষ পড়া ভুলে যাবে। কিন্তু বইমেলার উপচে পড়া ভিড় প্রতিবছর প্রমাণ করে দেয়, কাগজের গন্ধ আর অক্ষরের মায়া কোনো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা ই-বুক দিয়ে প্রতিস্থাপন করা সম্ভব নয়। বইমেলা আমাদের শেখায় কীভাবে ভাবতে হয়, কীভাবে অন্যের মতকে শ্রদ্ধা করতে হয় এবং কীভাবে নিজের সৃজনশীলতাকে বিকশিত করতে হয়।
একটি জাতির উন্নতির মাপকাঠি কেবল তার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বা বড় বড় দালানকোঠা নয়, বরং তার পাঠাভ্যাস এবং চিন্তার গভীরতাও বটে। বইমেলা সেই গভীরতা তৈরির সবচেয়ে বড় কারিগর। মেলায় আসা প্রতিটি বই একেকটি নতুন চিন্তার দুয়ার খুলে দেয়। বইমেলার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব। মেলা কেবল বিনোদনের জায়গা নয়, এটি আমাদের প্রকাশনা শিল্পের টিকে থাকার প্রধান অবলম্বন। লেখক থেকে শুরু করে মুদ্রণ শ্রমিক, প্রচ্ছদ শিল্পী, বাঁধাইকারী এবং বিক্রেতা—হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান ও জীবিকা জড়িয়ে থাকে এই একটি মাসকে কেন্দ্র করে।
প্রকাশকরা সারা বছর অপেক্ষা করেন এই মেলার জন্য, যেখানে তারা তাদের সৃজনশীল কাজের প্রতিফলন দেখতে পান। আবার পাঠকদের জন্য এটি একটি বড় সুযোগ, যেখানে তারা একই ছাতার নিচে দেশের সব প্রকাশনীকে খুঁজে পান। বইমেলার এই অর্থনৈতিক চাকা আমাদের সাংস্কৃতিক অর্থনীতিকে সচল রাখে। মেলা উপলক্ষে যে বিপুল পরিমাণ বই বিক্রি হয়, তা আমাদের সৃজনশীল শিল্পের বিকাশে অপরিহার্য। এবারের মেলা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে যে উৎসাহ দেখা যাচ্ছে, তা সত্যিই আশাব্যঞ্জক। নানা সমস্যার পাহাড় পেরিয়ে যখন মেলার ফটক খুলেছে, তখন দেখা গেছে সেই চিরচেনা দৃশ্য—হাতে হাত রেখে মেলাপ্রাঙ্গণে হাঁটছে মানুষ।
ছোটদের জন্য আলাদা ‘শিশু প্রহর’ মেলাটিকে আরও রঙিন করে তোলে। শিশুদের হাতে যখন তাদের প্রিয় রূপকথা, বিজ্ঞানের গল্প বা ভূতের বইটি ওঠে, তখন তাদের চোখের যে ঝিলিক দেখা যায়, তার চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কিছুই হতে পারে না। এই মেলাই আমাদের আগামীর প্রজন্মকে তাদের শেকড়ের সাথে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে। তাদের মনে বপন করে দিচ্ছে বই পড়ার বীজ, যা ভবিষ্যতে একটি সমৃদ্ধ, সহনশীল ও শিক্ষিত জাতি গঠনে ভূমিকা রাখবে। আমাদের সন্তানদের যদি আমরা ছোটবেলা থেকেই বইয়ের সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে পারি, তবে তারা বিপথগামী হবে না। বই তাদের সত্য ও সুন্দরের পথ দেখাবে।
বইমেলায় কেবল প্রতিষ্ঠিত লেখকরাই নন, প্রতিবছর শত শত তরুণ লেখকের আত্মপ্রকাশ ঘটে। এই তরুণদের সৃজনশীল চিন্তা আমাদের সাহিত্যের ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করছে। মেলা প্রাঙ্গণে বসে যখন কোনো প্রবীণ লেখক তাঁর নবীন পাঠকের সঙ্গে কথা বলেন, কিংবা যখন কোনো দূর-দূরান্তের গ্রাম থেকে আসা পাঠক তাঁর প্রিয় লেখকের অটোগ্রাফ নেন, তখন সেখানে যে প্রাণের মেলা বসে, তা অন্য কোনো উৎসবে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। এটিই বইমেলার সার্থকতা—যেখানে লেখক এবং পাঠকের মধ্যে কোনো দূরত্ব থাকে না। তবে উৎসবের আমেজের মাঝে আমাদের সচেতন থাকতে হবে মানসম্মত সাহিত্যের দিকেও। সংখ্যায় কয়েক হাজার বই প্রকাশিত হওয়ার চেয়ে গুটি কয়েক গুণে সমৃদ্ধ বই হওয়ার প্রয়োজনীয়তা অনেক বেশি।
পাঠকদেরও উচিত কেবল মলাট দেখে নয়, বরং বিষয়বস্তু বিচার করে বই কেনা। এতে ভালো লেখক ও প্রকাশকরা উৎসাহিত হবেন এবং আমাদের সাহিত্যের মান আরও উন্নত হবে। বইমেলার আরেকটি বড় দিক হলো এর বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবেশ। লিটল ম্যাগাজিন চত্বর থেকে শুরু করে মূল মঞ্চের প্রতিদিনের আলোচনা সভা—সবখানেই থাকে মননশীলতার ছোঁয়া। মেলায় আসা মানুষগুলো কেবল বই কিনে বাড়ি ফেরে না, তারা সাথে করে নিয়ে যায় একরাশ অনুপ্রেরণা।
এই অনুপ্রেরণা তাদের প্রাত্যহিক জীবনের একঘেয়েমি দূর করতে সাহায্য করে। বইমেলা আমাদের শেখায় কীভাবে একটি সুস্থ ও সুন্দর সমাজ বিনির্মাণ করতে হয়। মেলা চলাকালীন যে সাংস্কৃতিক আবহাওয়া তৈরি হয়, তা আমাদের তরুণ সমাজকে অশুভ শক্তি ও মাদকের হাত থেকে দূরে রাখতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। বইয়ের আলো যেখানে জ্বলে, সেখানে অন্ধকার স্থায়ী হতে পারে না। বইমেলার আরেকটি সৌন্দর্য হলো এর অসাম্প্রদায়িক চেতনা। এখানে কোনো বিভেদ নেই, নেই কোনো হিংসা। সবাই মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় শব্দের মায়ায়। এটি আমাদের জাতীয় ঐক্যের এক অনন্য নিদর্শন।
বইমেলার এই আয়োজন আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, একটি জাতির শ্রেষ্ঠ সম্পদ তার মেধা। মেলা প্রাঙ্গণে যখন হাজার হাজার মানুষ বই হাতে ঘুরে বেড়ায়, তখন মনে হয় দেশটা সত্যিই বদলে যাচ্ছে। তবে মেলার ব্যবস্থাপনা নিয়ে আমাদের আরও সজাগ হতে হবে। পাঠকদের নিরাপত্তা, সুপেয় পানির ব্যবস্থা এবং মেলার পরিবেশ যেন আরও উন্নত হয়, সেদিকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নজর দিতে হবে। বিশেষ করে ঢাকার বাইরে থেকে আসা পাঠকদের জন্য যাতায়াত ও বিশ্রামের সুব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
বইমেলা কেবল রাজধানী কেন্দ্রিক না হয়ে যদি বিভাগীয় শহরগুলোতেও আরও বড় পরিসরে আয়োজন করা যায়, তবে তা সারা দেশের মানুষের মধ্যে বই পড়ার আগ্রহ বাড়িয়ে দেবে। বইমেলা আমাদের আদর্শিক লড়াইয়ের প্রতীক। ভাষা আন্দোলনের রক্তভেজা স্মৃতিকে ধারণ করে এই মেলা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, আমরা বীরের জাতি। আমাদের অক্ষর আমাদের অলঙ্কার। মেলাটি হয়তো এক মাস পর শেষ হয়ে যাবে, প্যাভিলিয়নগুলো ভেঙে ফেলা হবে, কিন্তু মেলা থেকে অর্জিত জ্ঞান ও ভালোবাসা রয়ে যাবে আমাদের অন্তরে। বই পড়ার এই আন্দোলন যেন কেবল ফেব্রুয়ারিতে সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং বছরের প্রতিটি দিন প্রতিটি ঘরে বইয়ের আলো জ্বলে উঠুক।
ডিজিটাল ডিভাইসের আসক্তি কমিয়ে যদি আমরা প্রতিদিন অন্তত কিছু সময় বইয়ের পাতায় ডুব দেই, তবেই আমাদের সমাজ থেকে অজ্ঞানতার অন্ধকার দূর হবে। বইমেলা কেবল আয়োজনে নয়, বরং আমাদের আচরণে ও মননে বেঁচে থাকুক সারা বছর।

