ধানের শীষের ‘ল্যান্ডস্লাইড’ বিজয়, নিরঙ্কুশ সংখ্যা গরিষ্ঠতায় সরকার গড়ছে বিএনপি

0
ধানের শীষের ‘ল্যান্ডস্লাইড’ বিজয়, নিরঙ্কুশ সংখ্যা গরিষ্ঠতায় সরকার গড়ছে বিএনপি

বাংলাদেশ প্রতিবেদক: শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঐতিহাসিক ‘ল্যান্ডস্লাইড’ বিজয় অর্জন করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। সর্বশেষ পাওয়া বেসরকারি ফলাফল অনুযায়ী, ৩০০ আসনের মধ্যে বিএনপি ও তাদের সমর্থিত জোটের প্রার্থীরা ২১৩টি আসনে জয়লাভ করেছেন। এর মাধ্যমে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে পরবর্তী সরকার গঠনের জন্য নিরঙ্কুশ ম্যান্ডেট পেল দলটি।

নির্বাচন কমিশনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা ধীরগতিতে আসলেও সারা দেশ থেকে পাওয়া বেসরকারি ফলাফলে ধানের শীষের জয়জয়কার পরিলক্ষিত হয়েছে। এদিকে বিএনপি-পরবর্তী অবস্থানে রয়েছে জামায়াতে ইসলামী সমর্থিত জোট, যারা পেয়েছে ৭৭টি আসন।

বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান ঢাকা-১৭ এবং বগুড়া-৬—এই দুটি আসন থেকেই বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়েছেন। দলের এই বিশাল বিজয়ে যেন কোনো বিশৃঙ্খলা না হয়, সেজন্য তিনি বিজয় মিছিল না করার কঠোর নির্দেশনা দিয়েছেন। পরিবর্তে আজ শুক্রবার সারা দেশে মসজিদে দোয়া মাহফিলের আহ্বান জানানো হয়েছে। ড. মুহাম্মদ ইউনূস এই শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের জন্য দেশবাসীকে অভিনন্দন জানিয়েছেন।

ঢাকার ভোটের চিত্র: বিএনপি ১৪, জামায়াত-এনসিপি ৬

রাজধানী ঢাকার ২০টি আসনের মধ্যে ১৪টিতেই জয় পেয়েছে বিএনপি। জামায়াত ও এনসিপি জোট পেয়েছে ৬টি আসন।

বিজয়ী উল্লেখযোগ্য মুখ: তারেক রহমান (ঢাকা-১৭), মির্জা আব্বাস (ঢাকা-৮), গয়েশ্বর চন্দ্র রায় (ঢাকা-৩), ইশরাক হোসেন (ঢাকা-৬), আমান উল্লাহ আমান (ঢাকা-২), এবং ডা. শফিকুর রহমান (ঢাকা-১৫)।

ব্যতিক্রম: এনসিপি আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ঢাকা-১১ আসন থেকে বিজয়ী হয়েছেন।

সিলেটে বিএনপির আধিপত্য, উত্তরে জামায়াত শক্তিশালী এই বিভাগে বিএনপি অভাবনীয় সাফল্য দেখিয়েছে। ১৭টি আসনের মধ্যে ১৬টিতেই ধানের শীষের প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন। দেশের উত্তর ও পশ্চিমের জেলাগুলোতে জামায়াত জোটের প্রার্থীরা বেশ শক্তিশালী অবস্থান দেখিয়েছেন। বিশেষ করে সাতক্ষীরা, নীলফামারী ও কুষ্টিয়ার একাধিক আসনে তারা জয়ী হয়েছেন। চট্টগ্রাম ও বরিশাল অঞ্চলেও বিএনপির প্রার্থীরা আধিপত্য বজায় রেখেছেন।

এবারের নির্বাচনে বড় চমক ছিল বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতার পরাজয়। জামায়াত জোটের অন্যতম শীর্ষ নেতা খেলাফত মজলিসের আমীর মাওলানা মামুনুল হক, এবি পার্টির চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান মঞ্জু এবং জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার নির্বাচনে পরাজিত হয়েছেন।

অন্যদিকে, মেহেরপুর-১ ও ২ আসনে বিএনপির শক্তিশালী প্রার্থীদের হারিয়ে জয় ছিনিয়ে নিয়েছেন জামায়াতের প্রার্থীরা। পঞ্চগড়-১ আসনে এনসিপি’র সারজিস আলমকে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে পরাজিত করেছেন বিএনপির নওশাদ জমির।

প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এএমএম নাসির উদ্দিন নির্বাচনের স্বচ্ছতায় সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, “আমরা জাতিকে একটি উৎসবমুখর ও নিরপেক্ষ নির্বাচন উপহার দেওয়ার যে ওয়াদা করেছিলাম, তা পূরণ করতে পেরেছি। কোনো লুকোচুরি নেই, সম্পূর্ণ ট্রান্সপারেন্ট পদ্ধতিতে ভোট হয়েছে।” তিনি জানান, রেফারেন্ডামসহ প্রায় ২৫৪ মিলিয়ন ব্যালট মুদ্রণ ও বণ্টন করা ছিল এক বিশাল চ্যালেঞ্জ।

নির্বাচন শান্তিপূর্ণ হলেও ফলাফল ঘোষণা নিয়ে অসন্তোষ জানিয়েছেন জামায়াত আমীর ডা. শফিকুর রহমান। বৃহস্পতিবার রাতে এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে তিনি অভিযোগ করেন, অনেক আসনে গণনা শেষ হলেও রিটার্নিং অফিসাররা ফলাফল ‘ঝুলিয়ে’ রাখছেন। তিনি বিষয়টিকে ‘ইঁদুর-বিড়াল খেলা’ হিসেবে অভিহিত করে দ্রুত চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশের দাবি জানান।

জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ চূড়ান্তকরণে আয়োজিত গণভোটে বিপুল সংখ্যক ভোটার অংশ নিয়েছেন। প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, সনদের পক্ষে ‘হ্যাঁ’ ভোটের হার অনেক বেশি। তবে কমিশন এখনও ভোটের সুনির্দিষ্ট শতাংশ বা সংখ্যা প্রকাশ করেনি।

নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক গেজেট প্রকাশের পর পরবর্তী সরকার গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হবে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘ দেড় যুগ পর একটি অংশগ্রহণমূলক ও সহিংসতামুক্ত নির্বাচনে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ দেশের গণতন্ত্রের জন্য এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করল।