কালশীতে সরকারি জমি উদ্ধার অভিযানে রণক্ষেত্র: বস্তিবাসীদের হামলায় পুলিশ-সাংবাদিকসহ আহত ৭, পিছু হটে ফের উচ্ছেদ

0
কালশীতে সরকারি জমি উদ্ধার অভিযানে রণক্ষেত্র: বস্তিবাসীদের হামলায় পুলিশ-সাংবাদিকসহ আহত ৭, পিছু হটে ফের উচ্ছেদ

বাংলাদেশ প্রতিবেদকঃ রাজধানীর পল্লবীর কালশী বাউনিয়াবাঁধ এলাকায় জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের বেদখল হওয়া সরকারি জমি উদ্ধারকে কেন্দ্র করে এক নজিরবিহীন সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। বুধবার সকালে উচ্ছেদ অভিযান চলাকালে স্থানীয় অবৈধ দখলদার ও বস্তিবাসীদের অতর্কিত হামলার মুখে পড়েন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এবং পুলিশ সদস্যরা। দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া আর ইটপাটকেল নিক্ষেপে পুরো এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। হামলার তীব্রতায় পুলিশ প্রথমে পিছু হটতে বাধ্য হলেও পরবর্তীতে অতিরিক্ত ফোর্স নিয়ে পুনরায় অভিযান চালিয়ে অবৈধ স্থাপনাগুলো গুঁড়িয়ে দেয়।

জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, মিরপুরের সেকশন-১, ব্লক-এ এর পুনর্বাসন জোনের ৩ নম্বর রোডের ওপর এবং বস্তিবাসীদের জন্য নির্মিতব্য ৫৩৩ ফ্ল্যাট নির্মাণ প্রকল্পের জন্য অধিগ্রহণকৃত সরকারি জায়গায় দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ দখলদারিত্ব চলছিল। প্রায় ৫০ বিঘা সরকারি জমি দখল করে সেখানে গড়ে তোলা হয়েছিল অবৈধ বস্তিঘর ও ভাঙারির দোকান, গ্যারেজ ও চায়ের দোকান, মাদক স্পট এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক ক্লাব।

এই দীর্ঘমেয়াদি অবৈধ দখল উচ্ছেদ করতেই বুধবার সকাল ১০টার দিকে ঢাকা-১৬ আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) আবদুল বাতেন, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এবং বিপুল সংখ্যক পুলিশ সদস্যের উপস্থিতিতে এই অভিযান শুরু হয়।

অভিযান শুরুর পরপরই পরিস্থিতি আচমকা উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। উচ্ছেদের প্রতিবাদে কয়েকশ স্থানীয় বাসিন্দা ও দখলদার একযোগে লাঠিসোঁটা নিয়ে অভিযানকারী দলটির ওপর চড়াও হয়।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, শত শত মানুষ পুলিশকে লক্ষ্য করে চারদিক থেকে ইট-পাটকেল ও গাছের গুঁড়ি নিক্ষেপ করছে। আত্মরক্ষার্থে নারী পুলিশ সদস্যসহ অভিযানের দায়িত্বে থাকা কর্তাব্যক্তিরা দিগ্বিদিক দৌড়ে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করছেন। বেগতিক পরিস্থিতি দেখে উচ্ছেদ কাজে ব্যবহৃত বুলডোজার ও মিনি ট্রাক রেখেই পিছু হটেন ম্যাজিস্ট্রেট ও গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।

এই প্রাথমিক সংঘর্ষে অন্তত সাতজন পুলিশ সদস্য এবং কয়েকজন সংবাদকর্মী গুরুতর আহত হন। আহত পুলিশ সদস্যদের চিকিৎসার জন্য দ্রুত রাজারবাগ পুলিশ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

উচ্ছেদ অভিযানে হামলার এই খবর সরকারের উচ্চপর্যায়ে পৌঁছালে তাৎক্ষণিকভাবে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা আসে। দুপুরে বিরতির পর মিরপুর বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মো. মোস্তাক সরকারের নেতৃত্বে কয়েকশ অতিরিক্ত দাঙ্গা পুলিশ নিয়ে দ্বিতীয় দফায় অ্যাকশনে নামে প্রশাসন।

এবারও অলিগলি এবং আশপাশের ভবনের ছাদ থেকে পুলিশ ও বুলডোজার চালককে লক্ষ্য করে ইটবৃষ্টি শুরু করে বিক্ষোভকারীরা। তবে পুলিশ দমে না গিয়ে লাঠিচার্জ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেয় এবং শক্ত হাতে সড়কের ওপর গড়ে ওঠা সমস্ত অবৈধ দোকানপাট, গ্যারেজ ও স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেয়। দ্বিতীয় দফার এই আকস্মিক অভিযানে অনেক দোকানি তাদের মালামাল সরানোর সুযোগ পর্যন্ত পাননি।

উচ্ছেদ হওয়া স্থানীয় বাসিন্দা ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, কোনো ধরনের পূর্ব ঘোষণা বা লিখিত নোটিশ ছাড়াই এই উচ্ছেদ চালানো হয়েছে। তামান্না জেনারেল স্টোরের স্বত্বাধিকারী সুমন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমাদের থাকার জায়গা নেই। মাথা গোঁজার ঠাঁই থাকলে তো এখানে থাকতাম না। এখন কই যামু, কী খামু?” স্থানীয়দের দাবি, এই এলাকায় প্রায় ১০ থেকে ১৫ হাজার মানুষ বসবাস করেন, যাদের পুনর্বাসন না করে এই উচ্ছেদ মানবিক বিপর্যয় ডেকে এনেছে।

অন্যদিকে, মিরপুর বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মো. মোস্তাক সরকার জানান, সরকারি সম্পত্তি উদ্ধার করতে গিয়ে পুলিশকে পরিকল্পিত হামলার মুখোমুখি হতে হয়েছে। সরকারি কাজে বাধা ও পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

উদ্ধারকৃত জমিতে দ্রুত গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ শুরু হবে বলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। তবে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে কালশী এলাকায় এখনও থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।