সুন্দরবনে ৪ জলদস্যু বাহিনীর ৫২ সদস্যের আত্মসমর্পণ বন খুলতেই দস্যুমুক্তির নতুন বার্তা, নিরাপত্তা নিয়ে স্বস্তিতে বনজীবী-পর্যটক

0
বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনে ৪ জলদস্যু বাহিনীর ৫২ সদস্যের আত্মসমর্পণ বন খুলতেই দস্যুমুক্তির নতুন বার্তা, নিরাপত্তা নিয়ে স্বস্তিতে বনজীবী-পর্যটক

এস. এম. সাইফুল ইসলাম কবির: সুন্দরবনের উপকূলে তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা শেষে সুন্দরবনের দ্বার খোলার আগের দিনই বড় সাফল্য পেল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। সুন্দরবনে সক্রিয় চারটি জলদস্যু বাহিনীর প্রধানসহ ৫২ সদস্য র‌্যাবের কাছে আত্মসমর্পণ করেছেন। সোমবার (৩১ আগস্ট) তাদের আত্মসমর্পণের পর মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) বিষয়টি নিশ্চিত করে র‌্যাব-৬।

আত্মসমর্পণকারীদের মধ্যে বড় জাহাঙ্গীর বাহিনীর ১৬ জন, দুলাভাই ও আফজাল বাহিনীর ১৫ জন, আনারুল বাহিনীর ১৩ জন এবং আফতাব বাহিনীর ৮ জন সদস্য রয়েছেন।

র‌্যাব-৬ এর অধিনায়ক লে. কর্নেল নিস্তার আহমেদ জানান, সুন্দরবনকে জলদস্যু ও বনদস্যুমুক্ত রাখতে দীর্ঘদিন ধরে গোয়েন্দা নজরদারি ও অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। ধারাবাহিক অভিযানের পাশাপাশি পুনর্বাসনের সুযোগ থাকায় দস্যুদের একটি অংশ অপরাধের পথ ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার আগ্রহ দেখিয়েছে।

সুন্দরবনকে ঘিরে দীর্ঘদিনের বড় আতঙ্ক ছিল জলদস্যুদের অপহরণ, মুক্তিপণ আদায় ও সশস্ত্র তৎপরতা। জেলে, বাওয়ালি, মৌয়ালসহ বননির্ভর মানুষ জীবিকার প্রয়োজনে বনে প্রবেশ করলেও দস্যু আতঙ্ক তাদের নিত্যসঙ্গী ছিল। ফলে মাছ ধরা কিংবা বনজ সম্পদ আহরণে গিয়ে অনেকেই নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতেন।

এর আগে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানের মুখে সুন্দরবনের বিভিন্ন দস্যু বাহিনীর সদস্যরা আত্মসমর্পণ করলেও সাম্প্রতিক সময়ে নতুন কিছু চক্রের তৎপরতা এবং পূর্বে আত্মসমর্পণকারীদের কয়েকজনের পুনরায় অপরাধে জড়িয়ে পড়ার তথ্য সামনে আসে। এতে সুন্দরবনের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল।

এ অবস্থায় র‌্যাব-৬ গোয়েন্দা নজরদারি ও অভিযান জোরদার করে। একপর্যায়ে চার বাহিনীর ৫২ সদস্য আত্মসমর্পণে সম্মত হন। র‌্যাবের দাবি, এ আত্মসমর্পণের ফলে সুন্দরবনে সংঘবদ্ধ অপরাধের সাংগঠনিক শক্তি দুর্বল হবে এবং বনজীবীদের নিরাপদে জীবিকা নির্বাহের সুযোগ বাড়বে।

বন্যপ্রাণীর প্রজনন ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের লক্ষ্যে গত ১ জুন থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত তিন মাস সুন্দরবনে পর্যটক ও বনজীবীদের প্রবেশ বন্ধ ছিল। নিষেধাজ্ঞা শেষে আজ মঙ্গলবার থেকে অনুমতি ও প্রচলিত বিধিবিধান মেনে আবারও সুন্দরবনে প্রবেশের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

বন খোলার ঠিক আগের দিন ৫২ জলদস্যুর আত্মসমর্পণকে তাই তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখছেন বনজীবীরা। দীর্ঘদিন পর দস্যু আতঙ্ক কিছুটা কমবে—এমন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে জেলে, বাওয়ালি ও মৌয়ালদের মধ্যে।

তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, দস্যুদের আত্মসমর্পণ সুন্দরবনের নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হলেও এখানেই দায়িত্ব শেষ নয়। আত্মসমর্পণকারীরা যাতে পুনরায় অপরাধে না জড়ান, সে জন্য কার্যকর পুনর্বাসন, নিয়মিত নজরদারি এবং বনের প্রত্যন্ত এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতি নিশ্চিত করা জরুরি।

একই সঙ্গে জলদস্যুতার পাশাপাশি বন্যপ্রাণী শিকার, পাচার, অবৈধভাবে বনজ সম্পদ আহরণ ও সংঘবদ্ধ অপরাধ ঠেকাতেও নজরদারি বাড়াতে হবে।

র‌্যাব-৬ জানিয়েছে, আত্মসমর্পণকারীদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে আদালতে সোপর্দ করা হবে। সুন্দরবনের নিরাপত্তা, বনজীবীদের জীবন-জীবিকার সুরক্ষা এবং সংঘবদ্ধ অপরাধ দমনে তাদের অভিযান ও গোয়েন্দা নজরদারি অব্যাহত থাকবে।

বন খুলল—সঙ্গে খুলল জীবিকার দুয়ার। চার দস্যু বাহিনীর ৫২ সদস্যের আত্মসমর্পণ সেই দুয়ারে নিরাপত্তার নতুন বার্তা কতটা স্থায়ী করতে পারে, এখন সেটিই দেখার বিষয়।

উল্লেখ্য, সুন্দরবনের বন্যপ্রাণীর প্রজনন ও বিচরণ নির্বিঘ্ন রাখা এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের লক্ষ্যে ১ জুন থেকে ৩১ আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত তিন মাস সুন্দরবনে পর্যটক ও বনজীবীদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর ছিল। তিন মাসের এ নিষেধাজ্ঞা শেষে ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে প্রযোজ্য বিধিবিধান ও অনুমতি সাপেক্ষে সুন্দরবন পুনরায় পর্যটক ও বনজীবীদের জন্য উন্মুক্ত হচ্ছে।

সুন্দরবন পুনরায় উন্মুক্ত হওয়ার ঠিক আগের দিন চারটি জলদস্যু বাহিনীর ৫২ জন সদস্যের আত্মসমর্পণ বনজীবীদের নিরাপদে জীবিকা নির্বাহ,পর্যটকদের নিরাপদ চলাচল এবং সুন্দরবনকেন্দ্রিক স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে সুন্দরবনকেন্দ্রিক সংঘবদ্ধ অপরাধ নিয়ন্ত্রণে থাকলে অবৈধভাবে কাঠ ও অন্যান্য বনজ সম্পদ আহরণ, বন্যপ্রাণী শিকার ও পাচারসহ পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের জন্য ক্ষতিকর অপরাধ প্রতিরোধেও তা সহায়ক হবে। সুন্দরবনের নিরাপত্তা, বনজীবীদের জীবন ও জীবিকার সুরক্ষা এবং দেশের অমূল্য প্রাকৃতিক সম্পদ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে র‌্যাব সর্বদা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।