
কুমিল্লা প্রতিনিধি: কুমিল্লায় সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী জান্নাতুল তাজমিন (১৩) হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন করেছে পুলিশ। অটোরিকশাচালকের লোভ ও লালসার শিকার হয়ে প্রাণ হারাতে হয়েছে এই কিশোরীকে। পুলিশ জানিয়েছে, কক্সবাজার থেকে ফেরা এই ছাত্রীকে একা পেয়ে প্রথমে ধর্ষণ এবং পরবর্তীতে গলায় গামছা পেঁচিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। এই পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডে গ্রেপ্তার অটোরিকশাচালক মো. সুমন একাই জড়িত ছিল।
শনিবার (১০ অক্টোবর) সকাল ১০টায় জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে আয়োজিত এক গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ সম্মেলনে এ চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পঙ্কজ বড়ুয়া।
পুলিশের দেওয়া তথ্য ও নিহতের পরিবার সূত্রে জানা যায়, নিহত জান্নাতুল তাজমিন যশোর সদর উপজেলার ছাতিয়াতলা গ্রামের আব্দুল আলিমের মেয়ে। তার বাবা রেনেটা ওষুধ কোম্পানির কুমিল্লা রিজিয়নে চাকরি করার সুবাদে পরিবারটি কুমিল্লা নগরীর রেসকোর্স এলাকার একটি ভাড়া বাসায় বসবাস করতেন। তাজমিন কুমিল্লা নগরীর ফরিদা বিদ্যায়তন স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল (যদিও স্কুল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে সে নিয়মিত স্কুলে যাচ্ছিল না)।
ঘটনার সূত্রপাত গত ৪ অক্টোবর সকালে। ওই দিন বান্ধবীর বাসায় যাওয়ার কথা বলে বাসা থেকে বের হয় তাজমিন। এরপর গত ৭ অক্টোবর রাত ১২টা ১৯ মিনিটে তাকে কুমিল্লার পদুয়ারবাজার বিশ্বরোড এলাকার হোটেল নূরজাহানের সামনে দেখা যায়। তিনি কক্সবাজার থেকে একটি বাসে করে কুমিল্লায় ফেরেন।
শহরের রেসকোর্স এলাকার বাসায় ফেরার উদ্দেশ্যে তিনি হোটেল নূরজাহানের সামনে থেকে সুমন নামের এক সিএনজি অটোরিকশাচালকের গাড়ি ভাড়া করেন। গভীর রাত হওয়ায় এবং যাত্রীকে একা পেয়ে অটোরিকশাচালক সুমনের মাথায় কুবুদ্ধি চাপে। সে তাজমিনকে নির্দিষ্ট গন্তব্যে না নিয়ে ভিন্ন পথে গাড়ি চালাতে শুরু করে।
পথিমধ্যে পরিস্থিতি বেগতিক দেখে এবং চালকের আচরণ সন্দেহজনক মনে হলে তাজমিন চলন্ত অটোরিকশা থেকেই তার হোয়াটসঅ্যাপে বাবার নম্বরে লাইভ লোকেশন এবং মেসেজ পাঠিয়ে তাকে দ্রুত নিয়ে যাওয়ার আকুতি জানায়। কিন্তু গভীর রাত হওয়ায় বাবা আব্দুল আলিম তখন ঘুমাচ্ছিলেন, ফলে তিনি মেয়ের সেই শেষ বার্তা বা মেসেজটি দেখতে পাননি।
পুলিশ জানায়, অটোরিকশাটি বিজরা হয়ে রসুলপুর এবং শিকারীপাড়া পার হয়ে লালমাই উপজেলার জগতপুর এলাকার একটি নির্জন স্থানে পৌঁছায়। সেখানে গভীর রাতে কিশোরীকে জোরপূর্বক ধর্ষণ করে চালক সুমন। এরপর অপরাধ লুকাতে সিএনজিতে থাকা গামছা দিয়ে তার গলা পেঁচিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করে ঘাতক।
গত ৮ অক্টোবর সকালে কুমিল্লার লালমাই উপজেলার জগতপুর গ্রামের একটি ধানক্ষেত থেকে ওই কিশোরীর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এ সময় মরদেহের পাশ থেকে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশাও জব্দ করা হয়। পরে নিহতের পরিচয় শনাক্ত করা হয় এবং এ ঘটনায় নিহতের বাবা আব্দুল আলিম বাদী হয়ে লালমাই থানায় অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।
ঘটনার পর নড়েচড়ে বসে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) ও লালমাই থানা পুলিশ যৌথভাবে আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি ও গোয়েন্দা কার্যক্রম চালিয়ে চট্টগ্রাম থেকে মামলার একমাত্র সন্দেহভাজন ও অটোরিকশাচালক সুমনকে গ্রেপ্তার করে।
পরবর্তীতে আসামিকে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করলে সে হত্যার দায় স্বীকার করে এবং তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে নিহত তাজমিনের ব্যবহৃত আইফোনটি উদ্ধার করে পুলিশ।
সংবাদ সম্মেলনে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পঙ্কজ বড়ুয়া আরও বলেন, “প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সুমন স্বীকার করেছে যে সে একাই এই হত্যাকাণ্ডের পুরো ঘটনাটি ঘটিয়েছে। ধর্ষণের পর সিএনজিতে থাকা গামছা পেঁচিয়ে তাকে হত্যা করা হয়।” এ নৃশংস হত্যাকাণ্ডে জড়িত একমাত্র আসামির কঠোর শাস্তির দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় জনগণ ও নিহতের পরিবার।
