তত্ত্বাবধায়কের রূপরেখা নিয়ে জাতীয় সংসদে বৈঠক: প্রস্তাবিত উচ্চকক্ষে ‘ভাইস প্রেসিডেন্ট’ পদের চিন্তা, বিচার বিভাগকে মুক্ত রাখার প্রস্তাব

0
তত্ত্বাবধায়কের রূপরেখা নিয়ে জাতীয় সংসদে বৈঠক: প্রস্তাবিত উচ্চকক্ষে 'ভাইস প্রেসিডেন্ট' পদের চিন্তা, বিচার বিভাগকে মুক্ত রাখার প্রস্তাব

বাংলাদেশ প্রতিবেদকঃ দেশের ভবিষ্যৎ শাসনতান্ত্রিক কাঠামো ও নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠায় বড় ধরনের ইতিবাচক ও বৈপ্লবিক পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সুনির্দিষ্ট গঠন প্রক্রিয়া, আকার ও এখতিয়ার কেমন হবে—তা নিয়ে সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির বৈঠকে বিস্তারিত তাত্ত্বিক ও কৌশলগত আলোচনা হয়েছে।

শনিবার (২৪ অক্টোবর) জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত এই বিশেষ বৈঠকে দেশের শীর্ষস্থানীয় সংবিধান বিশেষজ্ঞ, জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও শিক্ষাবিদরা অংশ নেন। বৈঠক শেষে সংবাদ সম্মেলনে কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ আলোচনার নানা দিক গণমাধ্যমের সামনে তুলে ধরেন।

সংবাদ সম্মেলনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, সংবিধানে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ ব্যবস্থা চালু হলে প্রস্তাবিত ‘উচ্চকক্ষ’ (Upper House)-কে কেন্দ্র করে নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের বেশ কয়েকটি নতুন ধারণা বৈঠকে উঠে এসেছে।

প্রথম প্রস্তাব: সংসদের একই মেয়াদে উচ্চকক্ষ বিলুপ্ত না করে যদি বহাল রাখা যায়, তবে তার অধীনেই তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে উচ্চকক্ষের প্রধান হিসেবে ‘ভাইস প্রেসিডেন্ট’ পদ সৃষ্টি করা যেতে পারে, যিনি স্পিকারের দায়িত্ব পালন করবেন এবং নির্বাচনকালীন ব্যবস্থার তদারকি করবেন।

দ্বিতীয় প্রস্তাব: সরকারি দল ও বিরোধী দলের শতভাগ সম্মতিতে একজন স্পিকার নির্বাচন করা। ওই স্পিকারই নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব সামলাবেন।

উপদেষ্টা পরিষদ: নির্বাচনকালীন সরকারের প্রধানের পাশাপাশি অন্যান্য উপদেষ্টাদেরও সরকারি ও বিরোধী দলের যৌথ সম্মতিতে উচ্চকক্ষ বা বিশেষজ্ঞ নিরপেক্ষ ব্যক্তিবর্গের মধ্য থেকে নিয়োগের আইনি কাঠামো রাখার অভিমত এসেছে।

অতীতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনকে কেন্দ্র করে বিচার বিভাগ রাজনৈতিক বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছিল। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, বৈঠকে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সুপারিশের আলোকে বিচার বিভাগকে নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থার বাইরে রাখার তাত্ত্বিক আলোচনা হয়েছে। একই সাথে, রাষ্ট্রপতির হাতে বিশেষ ক্ষমতা বা শেষ বিকল্প হিসেবে দায়িত্ব দেওয়ার বিধানটি বাদ দিয়ে কীভাবে শতভাগ রাজনৈতিক ও সামাজিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে নির্দলীয় কাঠামো গড়া যায়, সে বিষয়ে জোর দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে এ বিষয়ে লিখিত প্রস্তাব আহ্বান করা হয়েছে।

২০১১ সালে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের প্রেক্ষাপট স্মরণ করে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, “সেই সময় বিশেষ কমিটির প্রায় সব সদস্যই তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বহাল রাখার পক্ষে মতামত দিয়েছিলেন। কিন্তু তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর একতরফা নির্দেশে জাতির ওপর ওই সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হয়।”

তিনি আরও স্পষ্ট করেন, আওয়ামী লীগ অতীতে অবৈধভাবে ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করতে নিজেদের মতো করে সংবিধানে হাত দিয়েছিল, কিন্তু জনগণের ভোটে নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার কোনো একক সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেবে না। সে লক্ষ্যে শুধু তত্ত্বাবধায়কই নয়, বরং সংবিধানে প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার ভারসাম্য আনয়ন, বিচার বিভাগের প্রকৃত স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং বহুল বিতর্কিত ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধনের বিষয়েও বিশদ আলোচনা চলছে।

সংবিধান সংশোধনের এই ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ায় রাজপথের ও সংসদের বিরোধী দলগুলোর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে কমিটি। বিএনপির প্রদত্ত ‘নোট অব ডিসেন্ট’ বা আপত্তি প্রসঙ্গে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, “বিরোধী দল যদি কোনো বিষয়ে নিজেদের অবস্থান শিথিল বা পরিবর্তন করতে চায়, তবে তাদের কমিটিতে এসে কথা বলতে হবে। আমরা চাই সর্বসম্মতির ভিত্তিতে, সবার সঙ্গে খোলামেলা আলোচনার মাধ্যমেই চূড়ান্ত সংবিধান সংশোধন বিল সংসদে উত্থাপিত হোক।”

কমিটি জানিয়েছে, অংশগ্রহণকারী বিশেষজ্ঞ ও দলগুলোর কাছ থেকে প্রাপ্ত লিখিত প্রস্তাবনাগুলো বিস্তারিত পর্যালোচনা করে একটি সুপারিশমালা (রিপোর্ট) প্রণয়ন করা হবে, যার ভিত্তিতে পরবর্তীতে মহান সংসদে নতুন সংশোধনী বিল আকারে তা পেশ করা হবে।