যৌতুক ও বাপের বাড়ির নাশতা নিয়ে বিবাদ: পটিয়ায় শাশুড়ির পিটুনিতে গর্ভবতী গৃহবধূর করুণ মৃত্যু

0
যৌতুক ও বাপের বাড়ির নাশতা নিয়ে বিবাদ: পটিয়ায় শাশুড়ির পিটুনিতে গর্ভবতী গৃহবধূর করুণ মৃত্যু

চট্টগ্রাম ব্যুরোঃ সামাজিক অনাচার ও শ্বশুরবাড়ির অমানবিক মানসিকতার বলি হলেন তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা এক নববিবাহিতা গৃহবধূ। চট্টগ্রামের পটিয়ায় বাপের বাড়ি থেকে আনা নাশতার পরিমাণ কম হওয়াকে কেন্দ্র করে শাশুড়ির নির্মম মারধরের শিকার হয়ে সিফাতুন নূর সিফাত (২২) নামের এক অন্তঃসত্ত্বা নারীর মৃত্যু হয়েছে।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) টানা ৯ দিন মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মর্মান্তিক এই ঘটনায় পুলিশ দ্রুত অভিযান চালিয়ে অভিযুক্ত শাশুড়ি রিজিয়া বেগমকে (৬০) গ্রেফতার করেছে।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, চন্দনাইশ পৌরসভার নয়াপাড়া এলাকার মো. নূরের মেয়ে সিফাতুন নূরের সঙ্গে মাত্র পাঁচ মাস আগে পারিবারিকভাবে বিয়ে হয় পটিয়ার কুসুমপুরা ইউনিয়নের প্রবাসী মো. তারেকের। বিয়ের পর থেকেই যৌতুক ও বাপের বাড়ির উপঢৌকন নিয়ে নানা মেজাজের কটূক্তি সহ্য করতে হচ্ছিল সিফাতকে।

গত ১৪ অক্টোবর (বুধবার) সন্ধ্যায় সিফাতের মা জুহিনুর আক্তার নিজের হাতে তৈরি করা নানারকমের বৈচিত্র্যময় নাশতা নিয়ে মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে যান। কিন্তু বাপের বাড়ির এই উপহার দেখে সন্তুষ্ট হতে পারেনি শ্বশুরবাড়ির লোকজন। “নাশতার পরিমাণ এত কম কেন?”—এই অজুহাতে সিফাত ও তার মায়ের ওপর চড়াও হন শাশুড়ি রিজিয়া বেগম।

প্রত্যক্ষদর্শী ও স্বজনদের অভিযোগ, কথার কাটাকাটির একপর্যায়ে সিফাতের শাশুড়ি রিজিয়া বেগম ক্ষিপ্ত হয়ে গর্ভবতী সিফাত ও তার মায়ের ওপর চড়াও হন। গর্ভবতী জেনেও সিফাতকে এলোপাতাড়ি কিল, ঘুষি ও পেটে নির্মমভাবে লাথি মারা হয়। শাশুড়ির প্রচণ্ড মারধরে সিফাত মারাত্মক জখম হন ও তার গর্ভপাতজনিত শারীরিক জটিলতা দেখা দেয়।

ওই রাতেই দুবাই থেকে সিফাতের স্বামী তারেক দেশে ফোন করে সিফাতের শারীরিক অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানান। খবর পেয়ে আশঙ্কাজনক অবস্থায় পরিবারের সদস্যরা সিফাতকে উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করান। সেখানে তার অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটলে দ্রুত আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে দীর্ঘ ৯ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর শুক্রবার শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন সিফাত।

নিহতের পিতা মো. নূর তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে অভিযোগ করেন, “আমার মেয়ে ৩ মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিল। শাশুড়ির শারীরিক নির্যাতনে আমার মেয়ে ও তার গর্ভের সন্তানের মৃত্যু হয়েছে। এই নির্মম শারীরিক নির্যাতন আড়াল করতে এবং পুলিশি ঝামেলা থেকে বাঁচতে শ্বশুরবাড়ির লোকজন শুরু থেকেই প্রচার করতে থাকে যে সিফাত নাকি বিষপান বা গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছে।”

স্বজনদের দাবি, এটি নিছক কোনো সাধারণ বিতর্ক নয়, বরং উপহারের অজুহাতে পরিকল্পিত নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ড।

এ বিষয়ে কুসুমপুরা ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান শওকত আকবর বলেন, “ঘটনাটি অত্যন্ত হৃদয়বিদারক ও নিন্দনীয়। তবে এর পেছনের প্রকৃত সত্য উন্মোচনে পুলিশি তদন্ত এবং ময়নাতদন্তের আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদন পাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।

ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে পটিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জিয়াউল হক বলেন, “গৃহবধূকে অমানবিক মারধর ও মৃত্যুর ঘটনায় নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ পেয়েছি। অভিযোগের ভিত্তিতে প্রধান অভিযুক্ত শাশুড়ি রিজিয়া বেগমকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে। নিহতের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে। রিপোর্ট হাতে এলে মৃত্যুর পেছনে আঘাত নাকি অন্য কোনো কারণ রয়েছে তা নিশ্চিত হওয়া যাবে। অপরাধী যেই হোক, আইন অনুযায়ী কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।”