শাহজাদপুর প্রতিনিধি: সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলার গাড়াদহ ইউনিয়নের টেকুয়াপাড়া গ্রামে গো-খামারিদের বাড়ি বাড়ি রক্তমাখা চিঠি দিয়ে হত্যা ও ডাকাতির হুমকি দিয়েছে দুর্বৃত্তরা।
চিঠিতে খামারিদের ঘরের দরজা খোলা রাখতে বলা হয়েছে। গত ৫ দিনে গ্রামের ১৫ টি বাড়িতে নিজেকে রঘু ডাকাত পরিচয় দিয়ে রক্তমাখা চিঠি দেয়া হয়েছে। এ ঘটনায় এলাকা জুড়ে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। এ বিষয়ে শুক্রবার (১৫ মে) রাতে টেকুয়াপাড়া গ্রামের খামারি আমজাদ হোসেন বাদি হয়ে থানায় একটি লিখিত অভিযোগ করেছেেন। এদিকে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ১৬ মে শুক্রবার দিবাগত রাত ১২ টার দিকে সিরাজগঞ্জের পুলিশ সুপার সাইফুল ইসলাম শানতু টেকুুয়াপাড়া গ্রাম পরিদর্শন করেছেন এবং এলাকাবাসীর সাথে মত বিনিময় করেছেন।
এ সময় শাহজাদপুর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হাফিজুর রহমান ও থানার অফিসার ইনচার্জ সাইফুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন। পুলিশ সুপার সাইফুল ইসলাম শানতু বলেন. যারা এ ধরনের চিঠি দিয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতি ঘটনোর চেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে তাদের কোন ছাড় দেয়া হবে না। যে কোন মূল্যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের কঠোর হস্তে দমন করা হবে। তিনি গ্রামবাসীদের নির্ভয়ে বসবাস করার আশ্বাস দিয়ে বলেন, নিজ হাতে কেউ আইন তুলে নেবেন না। গ্রামবাসীর নিরাপত্তায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আপনাদের সাথে আছে।
উপজেলার টেকুয়াপাড়া গ্রামের হাজি রফিকুল ইসলাম, আজাদুল ইসলাম ও সানোয়ার হোসেন জানান, গত ৪/৫ দিনে অন্তত ১৫ জনের বাড়িতে দুর্বৃত্তরা নিজেদের ‘রঘু ডাকাত’ পরিচয় দিয়ে রক্তমাখা চিঠি পাঠিয়েছে। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘কালকে আপনাদের বাড়িতে ডাকাতি করতে আসবো, তাই দরজা খোলা রাখবেন, নইলে জিন্দা খালাস…? ইতি রঘু ডাকাত’ ।
এদিকে একই গ্রামের আবু সাঈদ নামে এক কৃষকের বাড়ির গরু লুট করতে ব্যর্থ হয়ে তার মেয়ে বিথি খাতুনকে রক্তমাখা চিঠিতে হত্যার হুমকি দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। ওই চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে , ‘আপনার মেয়ের জন্য আজকে বেঁচে গেলেন, ভাইবেন না আবার বাঁচবেন। এই বছরের প্রথমবারে মিস হলো ওই ম্যাডামের জন্য, দেখে লেবো, মেয়ে মানুষের এত সাহস ভালো না। কালকে রাতে বাঁচতে চাইলে দরজা খোলা রাখবেন। না রাখলে জিন্দা লাস বানিয়ে দিবো। ইতি রঘু ডাকাত। কোড নম্বর ০৬ ‘। এভাবে প্রতিটি চিঠিতে কোড নম্বর দেওয়া আছে।
এলাকাবাসী আরো জানান, গত মঙ্গলবার চেতনানাশক স্প্রের মাধ্যমে গ্রামের আবু হোসেনের বাড়ির সবাইকে অচেতন করে ১টি ষাঁড় গরু এবং আমজাদ হোসেনের বাড়ির শোকেজের লকার ভেঙ্গে নগদ টাকা ও গহনা লুট করে নিয়ে গেছে দুর্বৃত্তরা। এ বিষয়ে আমজাদ হোসেন জানান , গত মঙ্গলবার মসজিদে মাগরিবের নামাজ শেষে বাড়ি ফিরে দেখেন তার স্ত্রী সারা খাতুন অচেতন হয়ে মেঝেতে পড়ে আছেন।
ঘরে ঢুকতেই তার নাকেও স্প্রের গন্ধ আসে এবং তিনিও অচেতন হয়ে পড়েন। গভীর রাতে জেগে উঠে দেখেন শোকেজের লকার ভেঙ্গে নগদ ১ লাখ টাকা, ১২ ভরি স্বর্ণের গহনা ও ৫ ভরি রূপার গহনাসহ প্রায় ৩০ লাখ টাকার জিনিসপত্র লুট করে নিয়ে গেছে চোরের দল। অপর ভুক্তভোগী আবু হোসেন জানান, জানালা দিয়ে চেতনানাশক স্প্রে করে তার বাড়ি থেকে ২ লাখ টাকা দামের একটি ষাঁড় গরু চুরি করে নিয়ে গেছে।
এদিকে, ডাকাতি ও চুরি আতংকে রাত কাটাচ্ছে টেকুয়াপাড়া গ্রামের বাসিন্দারা । সন্ধ্যা নামলেই গ্রামের রাস্তাঘাট ও বাজার জনশূন্য হয়ে পড়ে। গ্রামের যুবকরা রাত জেগে পাহাড়া দিলেও চুরি-ডাকাতি ঠেকাতে পারছে না। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে গত বৃহস্পতিবার (১৫ মে) রাতে এলাকাবাসী গ্রামের ক্লাব ঘরে এক জরুরি বৈঠকে বসেন। বৈঠক চলাবস্থায় দূর্বৃত্তরা আবু সাঈদ নামে এক খামারির বাড়ি থেকে ২টি গরু নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। এ সময় আবু সাঈদের মেয়ে শিক্ষক বিথি খাতুনের চিৎকার শুনে বৈঠকের লোকজন ঘটনাস্থলে ছুটে গেলে দুর্বৃত্তরা গরু ফেলে রেখে পালিয়ে যায়। এ ঘটনার পর ওই রাতেই বিথি খাতুনকে হুমকি দিয়ে তার ঘরে একটি রক্তমাখা চিঠি দেয়া হয়। সকালে ঘুম থেকে উঠে চিঠিটি হাতে পেয়ে বাড়ির লোকজন আতংকিত হয়ে পড়েন।
টেকুয়াপাড়া মিলন সংঘের সভাপতি দেলোয়ার হোসেন বলেন, দুর্বৃত্তরা গত ৪দিনে আলতাব হোসেন, ঈমান আলী, বাবর আলী মেম্বর, আব্দুল হামিদ, আব্দুল খালেক ফকির, বাবলু ফকির, শাহীন ফকির, ইসমাইল ফকির, জলিল মন্ডল, শাহ আলমসহ অন্তত ১৫ জনের বাড়িতে রক্তমাখা চিঠি পাঠিয়েছে। এ চিঠি পাওয়ার পর থেকে গ্রামের ক্লাবের সদস্যরা রাত জেগে গ্রাম পাহারা দিচ্ছে। তার পরেও চুরি ও চিঠি পাঠানো ঠেকানো যাচ্ছে না। তিনি বলেন, ঈদুল আযহা উপলক্ষে, গ্রামের প্রায় প্রতিটি বাড়িতে এক বা একাধিক কোরবানির ষাঁড় গরু লালন পালন করা হচ্ছে। এমতাবস্থায় চোরের উপদ্রব বৃদ্ধি পাওয়ায় গ্রামজুড়ে রীতিমতো আতংক রিরাজ করছে।
এ বিষয়ে শনিবার (১৭ মে) শাহজাদপুর থানার অফিসার ইনচার্জ সাইফুল ইসলাম বলেন, টেকুয়াপাড়া গ্রামের আমজাদ হোসেন বাদি হয়ে থানায় লিখিত অভিযোগ করেছেন। বিষয়টি ঊর্ধ্বতনায় কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশ সুপার মহোদয় শুক্রবার মধ্যরাতে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। পুলিশ সুপার মহোদয়ের নির্দেশে গ্রামে রাত্রিকালীন আনসার ও পুলিশি পাহাড়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
ওই গ্রামে সার্বক্ষণিক গোয়েন্দা নজরদারিতে রাখা হয়েছে। এছাড়া রাতে পাহাড়া দেয়ার জন্য গ্রামবাসীদের লাঠি, বাঁশি ও টর্চ লাইট সরবরাহ করা হয়েছে। ঘটনার সাথে জড়িত দুষ্কৃতিকারীদের দ্রুত সনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হবে বলে তিনি দৃঢ আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

