এক্সপ্রেসওয়েতে প্রাণ গেল মালয়েশিয়া প্রবাসীসহ একই পরিবারের ৪ জনের

0
এক্সপ্রেসওয়েতে প্রাণ গেল মালয়েশিয়া প্রবাসীসহ একই পরিবারের ৪ জনের

ফরিদপুর প্রতিনিধি: দীর্ঘ ১০টি বছর পর চিরচেনা মাতৃভূমিতে পা রেখেছিলেন মালয়েশিয়া প্রবাসী আরিফ ইসলাম। বিমানবন্দরে তাকে বুকে জড়িয়ে নিতে ছুটে গিয়েছিলেন মা, ভাই আর বোন। এক গাড়ি আনন্দ নিয়ে সবাই ফিরছিলেন যশোরের বাড়ি। কিন্তু চালকের চোখের এক পলকের ঘুম আর বেপরোয়া গতিতে নিমিষেই সেই আনন্দ রূপ নিল মহাশোকে। ঢাকা-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়েতে বিকল ট্রাকের পেছনে প্রাইভেটকারের ধাক্কায় চালকসহ ঝরে গেল একই পরিবারের চার সদস্যের প্রাণ।

মঙ্গলবার (২ জুন) ভোররাত পৌনে ৪টার দিকে ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার মালিগ্রাম এলাকায় এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে।

দুর্ঘটনায় নিহতরা হলেন—যশোর জেলার ঝিকরগাছা উপজেলার উজ্জ্বলপুর গ্রামের শহিদুল ইসলামের স্ত্রী নুরজাহান (৫০), তার দুই ছেলে মালয়েশিয়া প্রবাসী আরিফ ইসলাম (২৪) ও রাকিব (১৮), মেয়ে আয়েশা বেগম (২৮) এবং প্রাইভেটকারের চালক জাহিদ (২৫)।

এই ঘটনায় গুরুতর আহত অবস্থায় অলৌকিকভাবে বেঁচে গেছে দুই শিশু—আশরাফুল হোসেন (৭) ও তাছফিয়া (৩)। তারা বর্তমানে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছে। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, শিশুদের অবস্থা আশঙ্কাজনক।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, জীবিকার তাগিদে প্রায় এক দশক আগে মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমিয়েছিলেন ঝিকরগাছার বালিয়াডাঙ্গি গ্রামের আরিফুল ইসলাম। সোমবার রাতে তিনি ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করেন। তাকে স্বাগত জানাতে যশোর থেকে প্রাইভেটকার নিয়ে ঢাকা এসেছিলেন তার মা, ভাই, বোন ও ভাগ্নে-ভাগ্নি।

সবাইকে নিয়ে গাড়িটি যখন যশোরের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়, তখন ভোররাত পৌনে ৪টার দিকে মালিগ্রাম এলাকায় সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একটি বিকল গ্যাস সিলিন্ডারবাহী ট্রাকের পেছনে সজোরে ধাক্কা দেয় প্রাইভেটকারটি। গতি তীব্র থাকায় গাড়িটি দুমড়ে-মুচড়ে ট্রাকের নিচে ঢুকে যায়।

ভাঙ্গা ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন ম্যানেজার আবু জাফর জানান “ভোর সাড়ে ৪টার দিকে খবর পেয়ে আমরা দ্রুত ঘটনাস্থলে যাই। প্রাইভেটকারটি ট্রাকের পেছনে এমনভাবে আটকে ছিল যে, আমাদের গাড়িটির একাংশ কেটে চালকের মরদেহ এবং বাকিদের উদ্ধার করতে হয়েছে।”

ফায়ার সার্ভিস ও হাইওয়ে পুলিশ রক্তাক্তদের উদ্ধার করে ভাঙ্গা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক চালক জাহিদসহ রাকিব, নুরজাহান বেগম এবং আয়েশা বেগমকে মৃত ঘোষণা করেন। আশঙ্কাজনক অবস্থায় আরিফুলসহ দুই শিশুকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে মারা যান প্রবাসী আরিফুলও।

প্রত্যক্ষদর্শীদের ধারণা, এক্সপ্রেসওয়েতে প্রাইভেটকারটির গতি অত্যন্ত বেশি ছিল। তাছাড়া গভীর রাতে একটানা গাড়ি চালানোর কারণে চালকের চোখে ঘুম ঘুম ভাব থাকায় এই ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে থাকতে পারে।

নিহতদের স্বজন ইলিয়াস হোসেন (যার স্ত্রী আয়েশাও এই দুর্ঘটনায় মারা গেছেন) কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন “দীর্ঘদিন পর শ্যালক দেশে ফিরছিল। তাকে আনতে আমার স্ত্রী-সন্তান ও শাশুড়ি গিয়েছিলেন। যে দিনটি আমাদের জন্য সবচেয়ে আনন্দের হওয়ার কথা ছিল, সেটিই আজ আমাদের পুরো পরিবারকে ধ্বংস করে দিল।”

শিবচর হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান জানান, দুর্ঘটনাকবলিত প্রাইভেটকার ও ট্রাকটি জব্দ করা হয়েছে। নিহতদের স্বজনরা থানায় এসে পৌঁছেছেন এবং আইনি প্রক্রিয়া শেষে মরদেহ হস্তান্তরের কাজ চলছে। এই ঘটনায় একটি মামলা দায়েরের প্রক্রিয়াও চিকিৎসাধীন রয়েছে।