বাগেরহাটে শিশু ফাতেমার মৃত্যুর পর খানজাহান আলীর দীঘির কুমিরকে পাঠানো হলো সুন্দরবনের করমজলে

0
বাগেরহাটে শিশু ফাতেমার মৃত্যুর পর খানজাহান আলীর দীঘির কুমিরকে পাঠানো হলো সুন্দরবনের করমজলে

সাইফুল ইসলাম কবিরঃ বাগেরহাটের ঐতিহাসিক হযরত খানজাহান আলী (রহ.) মাজার সংলগ্ন দীঘিতে সাত বছরের শিশু ফাতেমা আক্তারের মর্মান্তিক মৃত্যুর পর অবশেষে দীঘিতে থাকা কুমিরটিকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। আজ বুধবার (৩ জুন) দুপুর ১২টার দিকে খুলনা থেকে আসা বিশেষজ্ঞ দল ও বন বিভাগের কর্মীরা যৌথ অভিযান চালিয়ে কুমিরটিকে অক্ষত অবস্থায় ধরতে সক্ষম হন।

নিরাপত্তা ঝুঁকির বিষয়টি বিবেচনা করে কুমিরটিকে সুন্দরবনের করমজল বন্যপ্রাণী প্রজনন কেন্দ্রে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়েছে জেলা প্রশাসন।

গত সোমবার (১ জুন) রাত ৮টার দিকে মাজার সংলগ্ন দীঘিতে পরিবারের সাথে গোসল করতে নামে সাত বছর বয়সী শিশু ফাতেমা আক্তার। প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী, গোসলের একপর্যায়ে একটি কুমির আকস্মিকভাবে শিশুটির পা কামড়ে ধরে পানির নিচে টেনে নিয়ে যায়। নিখোঁজের দীর্ঘ ৯ ঘণ্টা পর, মঙ্গলবার (২ জুন) ভোরে দীঘির মহিলা ঘাট এলাকা থেকে ফাতেমার নিথর মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

এই হৃদয়বিদারক ঘটনার পর স্থানীয় বাসিন্দা, মাজারের ভক্ত ও দেশি-বিদেশি দর্শনার্থীদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে। মাজার এলাকার নিরাপত্তা জোরদার এবং অবিলম্বে কুমিরটিকে সরিয়ে নেওয়ার দাবিতে সরব হয়ে ওঠেন সর্বস্তরের মানুষ।

জনমনে সৃষ্টি হওয়া তীব্র ক্ষোভ ও নিরাপত্তার বিষয়টি মাথায় রেখে মঙ্গলবার রাত ১০টায় বাগেরহাট জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে একটি জরুরি ও উচ্চপর্যায়ের সভা অনুষ্ঠিত হয়। জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট গোলাম মোহাম্মদ বাতেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সভায় জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, বন বিভাগ এবং মাজারের খাদেমদের প্রতিনিধিসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

সভায় বিস্তারিত পর্যালোচনার পর দীঘির কুমিরটিকে সুন্দরবনের করমজল বন্যপ্রাণী প্রজনন কেন্দ্রে হস্তান্তরের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক গোলাম মোহাম্মদ বাতেন বলেন, “সাম্প্রতিক এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার পর মাজার এলাকায় আসা দেশি-বিদেশি দর্শনার্থী ও ভক্তদের নিরাপত্তার বিষয়টি আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করেছি। পরিস্থিতি বিবেচনা করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে কুমিরটিকে করমজলে হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একই সাথে মাজার এলাকায় সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও নজরদারি আরও জোরদার করা হবে।”

বাগেরহাট পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মুহাম্মদ রেজাউল করিম চৌধুরী জানান, জেলা প্রশাসনের সিদ্ধান্তের পর আজ বুধবার সকালেই খুলনা থেকে বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞদের একটি বিশেষ দল বাগেরহাটে পৌঁছায়।

বিশেষজ্ঞ দলটি প্রথমে দীঘিতে কুমিরটির অবস্থান, গতিবিধি এবং আচরণ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে। এরপর দুপুরের দিকে বন বিভাগের মাঠপর্যায়ের কর্মীদের সহায়তায় দীঘিতে জাল ও বিশেষ ফাঁদ পেতে সফলভাবে কুমিরটিকে বাগে আনা হয়। দুপুর ১২টার দিকে কুমিরটিকে পানি থেকে ওপরে তুলে খাঁচাবন্দি করা হয়।

বন বিভাগ নিশ্চিত করেছে যে, উদ্ধারকৃত কুমিরটিকে আজই বিশেষ প্রক্রিয়ায় সুন্দরবনের করমজল বন্যপ্রাণী প্রজনন কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হবে এবং সেখানে সেটির পরিচর্যা করা হবে। এর মাধ্যমে দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যবাহী এই দীঘি আপাতত কুমিরমুক্ত হলো, যা দর্শনার্থীদের দীর্ঘদিনের আতঙ্ক দূর করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।