আহম্মদ কবিরঃ টাঙ্গুয়ার হাওর শুধু একটি পর্যটনকেন্দ্র নয়,এটি প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্যের এক অনন্য ভাণ্ডার। বর্ষায় বিস্তীর্ণ জলরাশি,চারপাশের পাহাড় আর নীল আকাশের মেলবন্ধনে হাওরজুড়ে তৈরি হয় অপূর্ব সৌন্দর্য।এই সৌন্দর্যের টানে প্রতিদিনই ছুটে আসছেন নানা প্রান্তের পর্যটক।পর্যটকের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাওরের পরিবেশের ওপরও বাড়ছে চাপ।প্লাস্টিক ও পলিথিনের বর্জ্য, শব্দদূষণসহ নানা কারণে হুমকিতে পড়ছে হাওরের স্বাভাবিক পরিবেশ।
এ অবস্থায় টাঙ্গুয়ার হাওরের প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় পরিবেশ অধিদপ্তর ও প্রশাসনের নিয়মিত অভিযান,নজরদারি ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম ইতিবাচক পরিবর্তনের বার্তা দিচ্ছে।পর্যটকদের মধ্যে লিফলেট বিতরণ,পরিবেশবিধি মেনে চলার নির্দেশনা,মোবাইল কোর্ট পরিচালনা এবং আইন লঙ্ঘনের ঘটনায় জরিমানার পাশাপাশি নেওয়া হচ্ছে আইনগত বিভিন্ন পদক্ষেপ।ফলে পর্যটন ব্যবস্থাপনায় ধীরে ধীরে ফিরছে শৃঙ্খলা,বাড়ছে পরিবেশ সচেতনতা।
সম্প্রতি টাঙ্গুয়ার হাওরে একটি হাউজবোট থেকে পলিথিন ও প্লাস্টিকের বোতল ফেলার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি পরিবেশ অধিদপ্তরের নজরে আসে। পরে সরেজমিন পরিদর্শনে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পর ‘দ্য হাউসবোট’-এর মালিক ওয়ালী উল আমীনকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়, সুনামগঞ্জের খবরের প্রতিবেদনে জানা যায়, বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ (সংশোধিত ২০১০)-এর ৬(ক) ধারা লঙ্ঘনের অভিযোগে তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। নোটিশে পরিবেশ ও প্রতিবেশ ব্যবস্থার ক্ষতি সাধনের অভিযোগে কেন ক্ষতিপূরণ আরোপসহ আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে না,তা ব্যাখ্যা করতে বলা হয়েছে। এ বিষয়ে শুনানিতে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ উপস্থিত হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।ঘটনাটি শুধু একটি হাউজবোটের বিরুদ্ধে নোটিশ দেওয়ার বিষয় নয়; বরং এটি টাঙ্গুয়ার হাওরের পরিবেশ রক্ষায় নাগরিক সচেতনতা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। একজন স্থানীয় নাগরিকের ধারণ করা ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি কর্তৃপক্ষের নজরে আসে এবং পরবর্তী সময়ে সরেজমিন পরিদর্শন ও আইনগত প্রক্রিয়া শুরু হয়।
টাঙ্গুয়ার হাওরের পরিবেশ রক্ষায় প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তরের কার্যক্রমে এখন শাস্তিমূলক ব্যবস্থার পাশাপাশি সচেতনতাকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পর্যটকদের মধ্যে লিফলেট বিতরণ,প্লাস্টিক ও পলিথিন ব্যবহার না করা,হাওরে বর্জ্য না ফেলা, উচ্চ শব্দে গান না বাজানো এবং সংরক্ষিত এলাকায় প্রবেশ না করার বিষয়ে সচেতন করা হচ্ছে।
চলতি পর্যটন মৌসুমে টাঙ্গুয়ার হাওরে একাধিক অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে।এসব অভিযানে পরিবেশবিধি লঙ্ঘনকারী হাউজবোট ও নৌযানের বিরুদ্ধে জরিমানা করা হয়েছে। একই সঙ্গে সংরক্ষিত এলাকায় প্রবেশ,শব্দদূষণ ও পরিবেশের ক্ষতি করে এমন কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকতে সতর্ক করা হয়েছে।বিশেষ করে পরিবেশ অধিদপ্তর ও প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগ টাঙ্গুয়ার হাওরের পর্যটন ব্যবস্থাপনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এতে পর্যটকদের মধ্যে যেমন নিয়ম মেনে চলার প্রবণতা বাড়ছে,তেমনি স্থানীয় পর্যটনসংশ্লিষ্টদের মধ্যেও পরিবেশ রক্ষায় দায়িত্বশীলতার প্রয়োজনীয়তা তৈরি হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল হালিম বলেন,টাঙ্গুয়ার হাওরের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তরের চলমান কার্যক্রমকে আমরা সাধুবাদ জানাই। তাদের নিয়মিত অভিযান ও সচেতনতামূলক উদ্যোগে স্থানীয়দের মধ্যেও পরিবেশ সংরক্ষণে সচেতনতা বেড়েছে। আমরাও এখন নিজ উদ্যোগে হাওরে ময়লা-আবর্জনা না ফেলা,অন্যদের নিরুৎসাহিত করা এবং পর্যটকদের সচেতন করার মতো কাজ করছি। হাওর আমাদের, তাই এর পরিবেশ রক্ষার দায়িত্বও আমাদের সবার।
স্থানীয় ইক্যু-ট্যুরিস্ট গাইড হাবিবুর রহমান বলেন, টাঙ্গুয়ার হাওর আমাদের জীবিকা ও গর্বের জায়গা। পর্যটকরা এখানে আসেন হাওরের নির্মল প্রকৃতি, জীববৈচিত্র্য ও সৌন্দর্য উপভোগ করতে। তাই এই প্রকৃতি রক্ষার দায়িত্ব আমাদের সবার।পরিবেশ অধিদপ্তর ও প্রশাসনের নিয়মিত অভিযান, সচেতনতামূলক কার্যক্রম ও লিফলেট বিতরণের কারণে পর্যটকদের মধ্যে আগের তুলনায় সচেতনতা বাড়ছে।এসব উদ্যোগ নিয়মিত অব্যাহত থাকলে টাঙ্গুয়ার হাওরে আরও শৃঙ্খলিত,পরিচ্ছন্ন ও পরিবেশবান্ধব পর্যটন ব্যবস্থা গড়ে উঠবে।
স্থানীয় ইক্যু-ট্যুরিস্ট গাইড অখিল তালুকদার বলেন, টাঙ্গুয়ার হাওরের সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্যই আমাদের পর্যটনের মূল আকর্ষণ।পরিবেশ নষ্ট হলে পর্যটনও একসময় হুমকির মুখে পড়বে। পরিবেশ অধিদপ্তর ও প্রশাসনের নিয়মিত অভিযান, সচেতনতামূলক কার্যক্রম এবং লিফলেট বিতরণের ফলে পর্যটক ও স্থানীয়দের মধ্যে পরিবেশ সংরক্ষণে সচেতনতা বাড়ছে। এ ধরনের কার্যক্রম আরও জোরদার ও ধারাবাহিক হলে টাঙ্গুয়ার হাওরে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই পর্যটন ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব।
টাঙ্গুয়ার হাওরের পরিবেশ রক্ষায় স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ প্রশাসনের নিয়মিত অভিযান থাকলেও স্থানীয় জনগণ,নৌযান চালক,পর্যটন ব্যবসায়ী ও পর্যটকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে হাওরের পরিবেশ রক্ষা করা কঠিন।সাম্প্রতিক বর্জ্য ফেলার ঘটনাটি এর একটি উদাহরণ। একজন স্থানীয় নাগরিক প্রতিবাদ করেছেন,ঘটনা ধারণ করেছেন,সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেছেন এবং শেষ পর্যন্ত বিষয়টি পরিবেশ অধিদপ্তরের আইনগত প্রক্রিয়ায় গড়িয়েছে। এতে স্পষ্ট হচ্ছে—হাওর রক্ষার দায়িত্ব শুধু প্রশাসনের নয়,সচেতন নাগরিকেরও।
টাঙ্গুয়ার হাওর শুধু একটি পর্যটনকেন্দ্র নয়;এটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমি। এর জলজ জীববৈচিত্র্য,মাছ,অতিথি পাখি ও প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষার পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গেও এর গভীর সম্পর্ক রয়েছে।তাই পর্যটন ব্যবস্থাপনায় এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—পর্যটনের প্রসার হবে,কিন্তু প্রকৃতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। এ জন্য নিয়মিত নজরদারি,কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা,প্লাস্টিক নিয়ন্ত্রণ,শব্দদূষণ রোধ,সংরক্ষিত এলাকায় প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি।
নিয়মিত অভিযান,মোবাইল কোর্ট,সচেতনতামূলক লিফলেট বিতরণ,পর্যটকদের নির্দেশনা এবং পরিবেশ আইন লঙ্ঘনের ঘটনায় কারণ দর্শানোর নোটিশ—সবকিছু মিলিয়ে টাঙ্গুয়ার হাওরে পরিবেশ সংরক্ষণে প্রশাসনিক তৎপরতা এখন আরও দৃশ্যমান।তবে এই উদ্যোগকে স্থায়ী পরিবর্তনে রূপ দিতে হলে ধারাবাহিকতা ধরে রাখা জরুরি। একদিনের অভিযান কিংবা সাময়িক সচেতনতা নয়—সারা বছর নজরদারি,কঠোর আইন প্রয়োগ, কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণই পারে টাঙ্গুয়ার হাওরের পরিবেশ ও পর্যটনের মধ্যে টেকসই ভারসাম্য তৈরি করতে।
টাঙ্গুয়ার হাওরের সৌন্দর্য শুধু আজকের পর্যটকের জন্য নয়;এটি আগামী প্রজন্মেরও সম্পদ। তাই প্রকৃতি রক্ষা করে পর্যটনকে এগিয়ে নেওয়াই এখন সময়ের দাবি।প্রকৃতি বাঁচলে টাঙ্গুয়ার বাঁচবে,আর টাঙ্গুয়ার বাঁচলেই টিকে থাকবে এই হাওরনির্ভর পর্যটন ও মানুষের জীবিকা।
সুনামগঞ্জ পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মোহাইমিনুল হক বলেন,টাঙ্গুয়ার হাওরের পরিবেশ রক্ষায় আমাদের কার্যক্রম ধারাবাহিকভাবে চলমান থাকবে। ভবিষ্যতে আরও বৃহৎ পরিসরে সচেতনতামূলক কার্যক্রম ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি হাওরের জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ সুরক্ষায় সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে সম্পৃক্ত করে সমন্বিতভাবে কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো.মেহেদী হাসান মানিক বলেন,টাঙ্গুয়ার হাওর শুধু পর্যটনের একটি গন্তব্য নয়,এটি আমাদের প্রাকৃতিক ঐতিহ্য ও জীববৈচিত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ।তাই এই হাওরের সৌন্দর্য উপভোগ করতে এসে কেউ যেন অসচেতনতা বা দায়িত্বহীন আচরণের মাধ্যমে এর পরিবেশের ক্ষতি না করেন।পর্যটনসংশ্লিষ্ট হাউজবোটের মালিক ও চালক,পর্যটকবাহী নৌকার মালিক ও চালক,পর্যটন ব্যবসায়ী,স্থানীয় জনগণ এবং পর্যটক—সবারই পরিবেশ রক্ষায় দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।আমরা চাই, টাঙ্গুয়ার হাওরে পর্যটন হবে,মানুষের কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়বে;কিন্তু কোনোভাবেই এর বিনিময়ে হাওরের জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ নষ্ট হবে না। এ লক্ষ্যেই প্রশাসনের পক্ষ থেকে সচেতনতামূলক কার্যক্রম,প্রচার-প্রচারণা ও নির্দেশনার পাশাপাশি বিধিনিষেধ অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগ করা হচ্ছে।পরিবেশের ক্ষতি করে এমন কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না।তবে আমাদের মূল লক্ষ্য শাস্তি দেওয়া নয়,সবাইকে সচেতন করে দায়িত্বশীল ও পরিবেশবান্ধব পর্যটন ব্যবস্থা গড়ে তোলা। টাঙ্গুয়ার হাওরের প্রকৃতি রক্ষায় প্রশাসনের এ উদ্যোগ ও নজরদারি ভবিষ্যতেও ধারাবাহিকভাবে অব্যাহত থাকবে।

