পীরগাছা সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়: দিনে ‘ত্রুটিপূর্ণ’ বলে ফেরত, রাতে ঘুষের বিনিময়ে দলিল সম্পাদন

0
পীরগাছা সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়: দিনে ‘ত্রুটিপূর্ণ’ বলে ফেরত, রাতে ঘুষের বিনিময়ে দলিল সম্পাদন

পীরগাছা প্রতিনিধি:রংপুরের পীরগাছা সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ে দিনভর দলিল নিয়ে অপেক্ষায় থা কেন সেবাগ্রহীতারা। কখনো কাগজের ত্রুটি, কখনো তথ্যের অসঙ্গতি বা অন্য কোনো অজুহাতে একের পর এক দলিল ফিরিয়ে দেওয়া হয়। অথচ সন্ধ্যা নামতেই বদলে যায় পুরো দৃশ্যপট। দিনের বেলায় যেসব দলিল ‘ত্রুটিপূর্ণ’ বলে ফেরত দেওয়া হয়েছিল, অতিরিক্ত টাকার বিনিময়ে রাতের আঁধারে সেগুলোই নিবন্ধিত (রেজিস্ট্রি) হয়ে যাচ্ছে।

দীর্ঘদিন ধরে চলা এই অনিয়মের চিত্র কর্মকর্তা বদল হলেও বিন্দুমাত্র পাল্টায়নি। এর আগে বিতর্কিত সাব-রেজিস্ট্রার বার্নার্ড মার্ডীর সময়েও এমন ঘুষ-বাণিজ্যের অভিযোগ নিয়ে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল। সম্প্রতি তিনি পীরগাছা থেকে সরে যাওয়ার পর অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয় সাব-রেজিস্ট্রার রিপন চন্দ্র মণ্ডলকে। কিন্তু দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম দিনেই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটায় স্থানীয়দের মাঝে চরম ক্ষোভ ও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত বুধবার (৮ অক্টোবর) দুপুর পর্যন্ত পীরগাছা সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ে প্রায় ৫০টি দলিল নানা ত্রুটির দোহাই দিয়ে ফেরত দেওয়া হয়। তবে অভিযোগ রয়েছে, দিনভর অপেক্ষার পর সন্ধ্যার দিকে ঘুষের বিনিময়ে ফেরত দেওয়া দলিলগুলোর বেশ কয়েকটি আবার গ্রহণ করা হয়। এরপর সরকারি সময়সীমা তোয়াক্কা না করে রাত পর্যন্ত চলে দলিল সম্পাদনের কাজ।

ভুক্তভোগী অনন্তরাম উচাপাড়া গ্রামের স্বপন বসাক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “পীরগাছা সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয় দুর্নীতিতে সয়লাব হয়ে গেছে। সকাল ১০টা থেকে বসে আছি, সারাদিন নানা বাহানায় দলিল ফেরত দিল। অথচ সন্ধ্যার পর সাব-রেজিস্ট্রার দলিলে স্বাক্ষর করলেন। অতিরিক্ত টাকা ছাড়া এখানে কাজ হচ্ছে না।”

একই অভিযোগ করেন তালুক ইশাদ দুধিয়াবাড়ি গ্রামের মিঠু মাস্টার ও স্থানীয় এক কৃষক। দুই শতক জমির দলিল রেজিস্ট্রি করতে আসা ওই কৃষক জানান, সারাদিন ঘোরানোর পর টাকা দিতে রাজি হতেই রাতে ডেকে এনে কাজ সম্পন্ন করে দেওয়া হয়।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের গত ৪ এপ্রিল ২০২৬ তারিখের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, সরকারি অফিসের সময়সীমা সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত নির্ধারিত। বিকেল ৪টার পর এবং রাতের আঁধারে দলিল নিবন্ধনের কার্যক্রম পরিচালিত হওয়ায় এই প্রক্রিয়ার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

এছাড়া নিবন্ধন আইন অনুযায়ী, কোনো দলিল রেজিস্ট্রি করতে অস্বীকৃতি জানালে সাব-রেজিস্ট্রারকে লিখিতভাবে তার কারণ লিপিবদ্ধ করতে হয় এবং সেবাগ্রহীতার সেই অনুলিপি পাওয়ার আইনি অধিকার রয়েছে। সচেতন মহল ও ভুক্তভোগীরা দাবি জানিয়েছেন—দিনে যে ৫০টি দলিল ফেরত দেওয়া হয়েছিল, সেগুলোর লিখিত কারণ, পরবর্তী সময়ে নিবন্ধিত দলিলের তালিকা, নিবন্ধনের সময় ও সরকারি ফি আদায়ের হিসাব স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা হোক।

পীরগাছা কার্যালয়ের এই অনিয়মের সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হওয়া সাব-রেজিস্ট্রার রিপন চন্দ্র মণ্ডলের অতীত রেকর্ডও বিতর্কিত। এর আগে রংপুরের গঙ্গাচড়ায় দায়িত্বে থাকাকালেও তাঁর বিরুদ্ধে ঘুষ ও নানা অনিয়মের খবর প্রকাশ পেয়েছিল। অন্যদিকে পূর্বতন কর্মকর্তা বার্নার্ড মার্ডীর বিরুদ্ধেও কমিশন নিয়মে দলিল নিবন্ধনের বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ ছিল।

কর্মকর্তা বদল হলেও অনিয়মের এমন বলয় না ভাঙায় সাধারণ সেবাগ্রহীতারা চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।

উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে কথা বলতে সাব-রেজিস্ট্রার রিপন চন্দ্র মণ্ডলের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

অন্যদিকে, পীরগাছা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জায়িদ ইমরুল মোজাক্কিন জানান, “সাব-রেজিস্ট্রার অফিস আমার সরাসরি অধীনস্থ দপ্তর নয়। তবে সাধারণ নাগরিকরা হয়রানির শিকার হচ্ছেন মর্মে লিখিত বা নির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে বিষয়টি উর্ধ্বোতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হবে এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”