এস. এম. সাইফুল ইসলাম কবির: দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের শিল্পনগরী খুলনায় কিশোর ও তরুণদের ব্যবহার করে অপরাধ বিস্তারের অভিযোগ ক্রমেই উদ্বেগজনক রূপ নিচ্ছে। খুন, চাঁদাবাজি, ছিনতাই ও মাদক কারবারসহ নানা অপরাধে তাদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে বিভিন্ন সন্ত্রাসী ও অপরাধী চক্র। নগরীর গণ্ডি পেরিয়ে এখন জেলা ও থানা পর্যায়েও কিশোরদের সংঘবদ্ধ করার চক্রান্ত ছড়িয়ে পড়ছে।
খুলনা জেলা পুলিশের প্রাথমিক তালিকায় বিভিন্ন অপরাধে জড়িত ২৫০ জন কিশোরের নাম উঠে এসেছে। খুলনা জেলা পুলিশ সুপার সরকার ওমর ফারুক জানান, পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশনায় মাঠপর্যায়ে কিশোর গ্যাং নির্মূলে জোর তৎপরতা শুরু হয়েছে। নগরীর বাইরে থানা পর্যায়েও আধিপত্য বিস্তার ও মাদক সরবরাহে কিশোরদের সংঘবদ্ধ করার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।
অতীতে নগরীতে ‘ডেঞ্জার বয়েজ’, ‘গোল্ডেন বয়েজ’, ‘টিপসি বয়েজ’ ও ‘কিং অব রূপসা’ নামক যেসব কিশোর গ্যাং সক্রিয় ছিল, তাদের অনেক সদস্যই পরবর্তীতে মূলধারার অপরাধী ও সন্ত্রাসী চক্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে পড়েছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, আইনজীবী ও বিশেষজ্ঞদের মতে কিশোরদের অপরাধ জগতে পা বাড়ানোর পেছনে প্রধান কারণসমূহ হলো সঠিক পারিবারিক বন্ধন ও তদারকি না থাকায় কিশোররা সহজেই সঙ্গদোষে পড়ে যাচ্ছে। স্মার্টফোনের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার, অনলাইন গেমে আসক্তি এবং মাদকের অর্থ জোগাড় করতে গিয়ে তারা চুরি, ছিনতাই ও রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক বা সামাজিক পক্ষের মিছিলে মহড়া দেওয়া ও আধিপত্য বিস্তারে তরুণদের সস্তায় ব্যবহার করা হচ্ছে। খেলাধুলা, বই পড়া ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের ঘাটতি তাদের অপরাধপ্রবণ পরিবেশের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী স্পষ্ট জানিয়েছে, কিশোর অপরাধীদের ব্যবহার করার পেছনে মূল উদ্দেশ্য হলো অপরাধের ‘গডফাদার’ বা মূল হোতাদের আড়ালে থাকা।
খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মো. সাজ্জাদুর রহমান বলেন, কিশোর গ্যাং ও সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু হয়েছে এবং ইতোমধ্যে দৃশ্যমান ফলাফল পাওয়া যাচ্ছে। দ্রুতই এ দৌরাত্ম্য নিয়ন্ত্রণে আসবে।
এসআরবি-৬-এর অধিনায়ক লে. কর্নেল নিস্তার আহমেদ বলেন, সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজিমুক্ত খুলনা গড়তে ২৪ ঘণ্টা অভিযান অব্যাহত রয়েছে। কিশোরদের অপরাধে সম্পৃক্ত করার এই প্রবণতা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
সিনিয়র আইনজীবী শাহ আলমসহ সংশ্লিষ্ট সামাজিক ও আইনি বিশ্লেষকদের মতে, শুধু কিশোরদের গ্রেপ্তার বা আইনের আওতায় আনাই এ সমস্যার দীর্ঘমেয়াদী সমাধান নয়।
কিশোরদের পেছনে থাকা মাদকের জোগানদাতা, অর্থ ও অস্ত্রের উৎস এবং রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। সন্তানদের পর্যাপ্ত সময় দেওয়া, তাদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং অনলাইন কার্যক্রমে নজর রাখা জরুরি। নৈতিক শিক্ষা, সুস্থ বিনোদন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত পদক্ষেপের মাধ্যমে এদের অপরাধ থেকে দূরে রাখতে হবে।
খুলনায় কিশোর গ্যাং দমনে মূল চ্যালেঞ্জ হলো—অপরাধের নেপথ্যে থাকা মূল কারিগর ও পৃষ্ঠপোষকদের চিহ্নিত করা। অন্যথায় একটি গ্যাং বিলুপ্ত হলেও নতুন নামে অন্য গ্যাংয়ের উত্থান ঠেকানো কঠিন হবে।

