এস. এম. সাইফুল ইসলাম কবির: আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নানা অভিযান, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে পুরস্কার ঘোষণা এবং কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারির মধ্যেও দেশজুড়ে বাড়ছে অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের দাপট। শহর থেকে গ্রাম—বিভিন্ন এলাকায় প্রকাশ্যে আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার, গুলি, হত্যাকাণ্ড, চাঁদাবাজি ও ছিনতাইয়ের ঘটনায় উদ্বেগ বাড়ছে সাধারণ মানুষের মধ্যে। চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে ঢাকা, খুলনা, চট্টগ্রামসহ ২১ জেলায় ১৩৮টি গুলির ঘটনায় অন্তত ৬৭ জন নিহত এবং ১৪৫ জন আহত হয়েছেন।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও মানবাধিকার সংগঠনসংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
তথ্য অনুযায়ী, এ সময় সবচেয়ে বেশি গুলির ঘটনা ঘটেছে খুলনায়। নয় মাসে সেখানে ৩৯টি ঘটনায় ১৫ জন নিহত ও ২০ জন আহত হয়েছেন। চট্টগ্রামে ৩১টি গুলির ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১৩ জন। রাজধানী ঢাকায় ঘটেছে ১৭টি গুলির ঘটনা। এসব ঘটনায় ছয়জন নিহত এবং ১৫ জন আহত হয়েছেন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ২০২৪ সালে দেশের বিভিন্ন থানা ও পুলিশ ফাঁড়ি থেকে লুট হওয়া বিপুলসংখ্যক আগ্নেয়াস্ত্রের একটি বড় অংশ এখনো উদ্ধার হয়নি। ওই সময় পুলিশের কাছ থেকে লুট হওয়া ৫ হাজার ৭৬৩টি আগ্নেয়াস্ত্রের মধ্যে ১ হাজার ৩০০টির বেশি এখনো উদ্ধার হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। পাশাপাশি সীমান্তপথে অবৈধভাবে দেশে ঢুকছে আগ্নেয়াস্ত্র। এসব অস্ত্র অপরাধীদের হাতে পৌঁছানোর কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে।
সূত্রের হিসাবে, ২০২৫ সালেও দেশে গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা ছিল উদ্বেগজনক। ওই বছর ২৫০ জনের বেশি মানুষ গুলিবিদ্ধ হন এবং অন্তত ৮০ জন নিহত হন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, বর্তমানে শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত বিভিন্ন এলাকায় অস্ত্রধারী অপরাধীচক্র সক্রিয়। এসব চক্রের সঙ্গে কিশোর ও তরুণদের সম্পৃক্ততা বাড়ছে। অর্থের বিনিময়ে তারা বিভিন্ন অপরাধে ভাড়ায় ব্যবহৃত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় পর্যায়ে গড়ে ওঠা এসব অস্ত্রধারী চক্রের কেউ কেউ মাদক বিক্রির স্পট নিয়ন্ত্রণ, চাঁদাবাজি, ছিনতাই ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। কোথাও কোথাও প্রকাশ্যে অস্ত্র প্রদর্শন করে এলাকায় আতঙ্ক সৃষ্টি করা হচ্ছে।
অভিযোগ রয়েছে, পথচারীদের অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে সর্বস্ব লুটে নেওয়ার ঘটনাও ঘটছে। তবে ভয় ও নিরাপত্তাহীনতার কারণে অনেক ভুক্তভোগী থানায় অভিযোগ করতে সাহস পাচ্ছেন না।
অবৈধ ও লুণ্ঠিত অস্ত্র উদ্ধারে সরকারের পক্ষ থেকে অভিযান জোরদার করা হয়েছে। এমনকি অস্ত্রের সন্ধান দিতে তথ্য প্রদানকারীদের জন্য বড় অঙ্কের আর্থিক পুরস্কার ঘোষণার কথাও জানানো হয়েছে। লুণ্ঠিত অস্ত্র উদ্ধারে বিশেষ ইউনিট গঠনের উদ্যোগের কথাও বলা হয়েছে।
সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও মাদক নিয়ন্ত্রণে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখাতে ব্যর্থ পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
তবে এসব উদ্যোগের পরও মাঠপর্যায়ে অস্ত্রধারীদের তৎপরতা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।
পুলিশের বিশেষ অভিযানের পরিসংখ্যানেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জটিল চিত্র পাওয়া যায়। গত ১ মে থেকে ২৬ আগস্ট পর্যন্ত দেশব্যাপী বিশেষ অভিযানে ৫৩ হাজার ৫১৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে সূত্র জানিয়েছে।
ওই সময়ে পুলিশ ৪৩৮টি আগ্নেয়াস্ত্র, ৪ হাজার ৭২২ রাউন্ড গুলি ও কার্তুজ, ১৬৫টি ম্যাগাজিন, ৬৫টি ককটেল, সোয়া দুই কেজি গানপাউডার, ৮৯৩টি দেশীয় অস্ত্র, ৭১টি অস্ত্রের যন্ত্রাংশ এবং ২১টি অস্ত্র ও বোমা তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার করেছে। এ ছাড়া ১০ হাজার ৩০০টি চকোলেটবাজিও উদ্ধার করা হয়।
উদ্ধার হওয়া আগ্নেয়াস্ত্রের মধ্যে রয়েছে ১৫৩টি পিস্তল, ৪৮টি শ্যুটারগান, ৪৫টি এলজি, ২৬টি রিভলবার, ১০৮টি বন্দুক, ২৬টি পাইপগান, সাতটি শটগান, সাতটি রাইফেল, তিনটি এসএমজি, ১২টি এয়ারগান ও একটি পেনগান।
মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটনের মতে, সাম্প্রতিক অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বিবেচনায় দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে—এমনটি বলার সুযোগ কম।
তিনি বলেন, অপরাধীরা প্রকাশ্যে একের পর এক ঘটনা ঘটাচ্ছে। ফলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাবোধে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, শুধু অস্ত্র উদ্ধার করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। লুণ্ঠিত অস্ত্রের পূর্ণাঙ্গ হিসাব, উদ্ধার না হওয়া অস্ত্রের অবস্থান শনাক্ত, সীমান্ত দিয়ে অস্ত্রের প্রবেশ বন্ধ, অস্ত্রের উৎস ও সরবরাহকারী চক্র শনাক্ত এবং অস্ত্রধারী অপরাধীদের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার—সবকিছুকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নিতে হবে।
নইলে একদিকে অভিযান ও গ্রেপ্তার চললেও অন্যদিকে নতুন অস্ত্র ও নতুন অস্ত্রধারী তৈরি হতে থাকবে। আর তার সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হবে সাধারণ মানুষকেই।

