জোরপূর্বক শ্রম দমনে ব্যর্থতার দায়: ৬০ দেশের পণ্যে ট্রাম্প প্রশাসনের অতিরিক্ত শুল্কের প্রস্তাব, ঝুঁকিতে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত

0
জোরপূর্বক শ্রম দমনে ব্যর্থতার দায়: ৬০ দেশের পণ্যে ট্রাম্প প্রশাসনের অতিরিক্ত শুল্কের প্রস্তাব, ঝুঁকিতে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত

অর্থনৈতিক প্রতিবেদকঃ জোরপূর্বক শ্রমের (ফোর্সড লেবার) মাধ্যমে উৎপাদিত পণ্যের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার অভিযোগে বাংলাদেশসহ বিশ্বের ৬০টি দেশের ওপর ১০ থেকে ১২.৫ শতাংশ পর্যন্ত অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের এক দূরপ্রসারী প্রস্তাব উন্মোচন করেছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। স্থানীয় সময় মঙ্গলবার (২ জুন) যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির দপ্তর (ইউএসটিআর) ১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইনের ‘সেকশন ৩০১’ (Section 301)-এর অধীনে পরিচালিত এক তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে এই ঘোষণা দেয়।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের এক রায়ে ট্রাম্প প্রশাসনের পূর্ববর্তী জরুরি শুল্ক ব্যবস্থার একটি বড় অংশ আইনি ধাক্কায় বাতিল হয়ে যায়। সেই ধাক্কা সামলে সম্পূর্ণ নতুন আইনি কৌশলে মার্কিন উৎপাদন খাত ও অভ্যন্তরীণ শ্রমিকদের সুরক্ষায় এই বিকল্প বাণিজ্যিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।

ইউএসটিআর-এর প্রায় ১০০ পৃষ্ঠার এক দীর্ঘ তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্যের অনুপ্রবেশ ঠেকাতে এবং নিজস্ব আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে সংশ্লিষ্ট ৬০টি দেশ সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। এই ব্যর্থতা মার্কিন বাণিজ্যকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি (ইউএসটিআর) অ্যাম্বাসেডর জেমিসন গ্রিয়ার এক কড়া বিবৃতিতে বলেন “আমাদের প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদারদের এই ব্যর্থতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমিকদের আন্তর্জাতিক বাজারে একটি চরম অসম ও বৈষম্যমূলক প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে হচ্ছে। আমরা এই বৈষম্য আর বরদাশতে রাজি নই।”

প্রতিবেদনে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) ২০২১ সালের একটি পরিসংখ্যান টেনে বলা হয়, বিশ্বে বর্তমানে প্রায় ২ কোটি ৭৬ লাখ মানুষ জোরপূর্বক শ্রমের শিকার। বিশ্বজুড়ে এই অমানবিক প্রথা বন্ধে বাণিজ্যিক অংশীদারদের আরও কঠোর হওয়ার তাগিদ দিয়েছে ওয়াশিংটন।

শুল্কের বিন্যাস: দুই ভাগে বিভক্ত ৬০টি দেশ

১০ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক (১৫টি দেশ ও অঞ্চল): এই তালিকায় বাংলাদেশের সাথে রয়েছে কানাডা, মেক্সিকো, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ), তাইওয়ান, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, কম্বোডিয়া, আর্জেন্টিনা, ইকুয়েডর, এল সালভাদর এবং গুয়াতেমালা।

১২.৫ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক (বাকি ৪৫টি দেশ): এই তালিকায় রয়েছে চীন, ভারত, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ব্রাজিল ও সুইজারল্যান্ডের মতো বড় বড় অর্থনীতি।

বাংলাদেশের জন্য এই নীতি অত্যন্ত সংবেদনশীল, কারণ যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে দেশের প্রধান রপ্তানি পণ্যই হলো তৈরি পোশাক। তবে ইউএসটিআর এই প্রস্তাবে একটি বিশেষ ‘টেক্সটাইল মেকানিজম’ বা বস্ত্র কৌশলের প্রস্তাব করেছে। এর আওতায় একটি নির্দিষ্ট কোটা বা ভলিউম পর্যন্ত পোশাক ও টেক্সটাইল সামগ্রী কিছুটা কম শুল্ক হারে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের সুযোগ পাবে। তবে সেই কোটার পরিমাণ বা হ্রাসকৃত শুল্কের হার কত হবে, তা এখনও খোলাসা করা হয়নি। এই বিশেষ ব্যবস্থার কার্যকর ব্যবহারের ওপরই নির্ভর করছে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের ভবিষ্যৎ চাপ।

মার্কিন অভ্যন্তরীণ বাজার ও সরবরাহ চেইনে যেন বড় ধরনের মুদ্রাস্ফীতি বা বিশৃঙ্খলা তৈরি না হয়, সেজন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ পণ্যকে এই অতিরিক্ত শুল্কের আওতার বাইরে বা বিশেষ ছাড়ে রাখা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে জালানি তেল, গ্যাস ও বিরল খনিজ পদার্থ। জীবন রক্ষাকারী ওষুধ এবং জৈব রাসায়নিক সামগ্রী। উড়োজাহাজের যন্ত্রাংশ। গরুর মাংস, কফি, টমেটো, কলা ও নির্দিষ্ট কিছু ফল-সবজি। কানাডা ও মেক্সিকোর ক্ষেত্রে উত্তর আমেরিকা মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির (USMCA) শর্ত মেনে চলা পণ্যগুলো শুল্কমুক্ত সুবিধা বজায় রাখতে পারবে।

ট্রাম্প প্রশাসনের এই নতুন শুল্ক নীতি এখনই চূড়ান্ত বা কার্যকর হচ্ছে না। ইউএসটিআর জানিয়েছে, এর পরবর্তী প্রক্রিয়াগুলো হবে নিম্নরূপ:

জনমত ও শুনানি নিবন্ধন: আগামী ২২ জুনের মধ্যে শুনানিতে অংশ নিতে ইচ্ছুক ব্যক্তিদের আবেদন ও জবানবন্দির সারসংক্ষেপ জমা দিতে হবে। লিখিত মতামত গ্রহণ: প্রস্তাবিত এই শুল্কের ওপর আগামী ৬ জুলাই, २०२৬ পর্যন্ত ব্যবসায়ী, অংশীজন ও সাধারণ মানুষ লিখিত মতামত জানাতে পারবেন। গণশুনানি: আগামী ৭ জুলাই ওয়াশিংটনে এই বিষয়ে একটি উন্মুক্ত ও প্রকাশ্য গণশুনানির আয়োজন করা হয়েছে।

চলতি বছরের ২০ ফেব্রুয়ারি ট্রাম্প প্রশাসন যে ১০ শতাংশ অস্থায়ী জরুরি শুল্ক আরোপ করেছিল, তার মেয়াদ আগামী ২৪ জুলাই শেষ হতে যাচ্ছে। তার আগেই এই দীর্ঘমেয়াদী ‘সেকশন ৩০১’ শুল্ক প্রস্তাব আসায় বৈশ্বিক বাণিজ্যে বড় ধরনের আলোড়ন তৈরি হয়েছে। অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, চূড়ান্ত শুনানির পর এই শুল্ক কাঠামো কার্যকর হলে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য মার্কিন বাজারে টিকে থাকার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাবে, যা তৈরি পোশাকসহ সামগ্রিক রপ্তানি আয়ে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।