বাংলাদেশ প্রতিবেদকঃ দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত বিচ্যুতি আর ইতিহাসের একপেশে বয়ান থেকে বেরিয়ে আসছে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা। ২০২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের পাঠ্যপুস্তকে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের ঘোষণা দিয়েছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। দীর্ঘমেয়াদী সংস্কারের অংশ হিসেবে ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানসহ প্রকৃত সত্য তুলে ধরার পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে সাজানো হচ্ছে নতুন এই পাঠ্যক্রম।
জাতীয় বার্তা সংস্থা বাসস’কে দেওয়া এক একান্ত সাক্ষাৎকারে এসব চাঞ্চল্যকর ও গঠনমূলক তথ্য জানিয়েছেন এনসিটিবি’র চেয়ারম্যান মো. মাহবুবুল হক পাটওয়ারী।
এনসিটিবি চেয়ারম্যান স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, অতীতে পাঠ্যপুস্তকে ইতিহাসের যে বিকৃতি ঘটেছিল, বিশেষজ্ঞ কমিটির মাধ্যমে তা নিরপেক্ষভাবে সংশোধন করা হচ্ছে।
মুক্তিযুদ্ধে বীর নায়কদের অবদানকে কোনো একপেশে স্বীকৃতিতে সীমাবদ্ধ না রেখে কার কী ভূমিকা ছিল, তা সঠিকভাবে উপস্থাপন করা হবে। পাঠ্যবইয়ে স্থান পাচ্ছে ৯০-এর গণঅভ্যুত্থান থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের বিস্তারিত ইতিহাস।
পাঠ্যবই পরিমার্জনে দেশের শীর্ষস্থানীয় ৩২০ জন বিশেষজ্ঞ দিনরাত কাজ করছেন। এর মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও গবেষকরা রয়েছেন।
প্রাথমিক থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত ইংরেজি ভার্সনসহ মোট ৬০১টি পাঠ্যপুস্তক পরিমার্জন করা হচ্ছে। আগামী জুলাইয়ের মধ্যে পরিমার্জনের কাজ শেষ করে মুদ্রণের প্রস্তুতি নেওয়া হবে, যাতে ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারিতেই শিক্ষার্থীরা বই হাতে পায়।
শিক্ষার্থীদের ডিজিটাল আসক্তি কমাতে এবং পড়াশোনাকে আনন্দদায়ক করতে চতুর্থ ও ষষ্ঠ শ্রেণিতে যুক্ত হচ্ছে অভিনব কিছু বই।
খেলাধুলা ও সংস্কৃতি (৪র্থ শ্রেণি): শিশুদের শারীরিক কর্মকাণ্ডে উৎসাহিত করতে সাতটি গেমসের ভিত্তিতে এই বইটি সাজানো হয়েছে।
লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস (৬ষ্ঠ শ্রেণি): শিক্ষার্থীরা যাতে ভীতিহীনভাবে আনন্দের সঙ্গে শিখতে পারে, সেজন্য পরীক্ষামূলকভাবে এই বই চালু হচ্ছে।
টেকনিক্যাল ও ভোকেশনাল শিক্ষা (৬ষ্ঠ শ্রেণি): কারিগরি শিক্ষার প্রতি উৎসাহ বাড়াতে আগামী বছর থেকেই এই বই যুক্ত করা হবে।
পুরোনো আমলের আইসিটি বইয়ের আমূল পরিবর্তন ঘটিয়ে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত বইগুলো প্রায় নতুনভাবে সাজানো হচ্ছে। বর্তমান সময়ের চাহিদার কথা মাথায় রেখে এতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (Artificial Intelligence) ও আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটানো হয়েছে।
এনসিটিবি চেয়ারম্যান জানান, বর্তমান সরকারের অঙ্গীকার অনুযায়ী নতুন কারিকুলামের মূল দর্শন হবে ‘অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিক্ষা’। এতে বইয়ের সংখ্যা কমবে এবং ব্যবহারিক শিক্ষার পরিধি বাড়বে। ২০২৭ সালে এই সংস্কার শুরু হলেও ২০২৮ শিক্ষাবর্ষে একটি পূর্ণাঙ্গ নতুন কারিকুলাম চালুর লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে বোর্ড।
এনসিটিবি চেয়ারম্যানের বার্তা: “শিক্ষার্থীরা যখন পাঠ্যবইয়ে প্রকৃত সত্য খুঁজে পাবে এবং আনন্দের সঙ্গে শিখবে, তখন অভিভাবকরাও এই ইতিবাচক পরিবর্তনকে সাদরে গ্রহণ করবেন। আমরা শিক্ষার্থীদের হাতে একটি বিচ্যুতিমুক্ত ও আধুনিক পাঠ্যপুস্তক তুলে দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।”

