ভোটের ফল বেরোতেই অশান্ত পশ্চিমবঙ্গ: সংখ্যালঘু ও বিরোধীদের ওপর সুসংগঠিত হামলার অভিযোগে উত্তাল এপিসিআর রিপোর্ট

0
ভোটের ফল বেরোতেই অশান্ত পশ্চিমবঙ্গ: সংখ্যালঘু ও বিরোধীদের ওপর সুসংগঠিত হামলার অভিযোগে উত্তাল এপিসিআর রিপোর্ট

বাংলাদেশ প্রতিবেদকঃ ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) জয়ের পর পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলেছে ‘অ্যাসোসিয়েশন ফর প্রোটেকশন অফ সিভিল রাইটস’ (এপিসিআর)। সংস্থাটির প্রকাশিত এক সাম্প্রতিক রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে, ৪ মে থেকে ৭ মে—এই চার দিনে রাজ্যের অন্তত আটটি জেলায় ব্যাপক সহিংসতা, সম্পত্তি দখল এবং সাম্প্রদায়িক উস্কানির ঘটনা ঘটেছে।

এপিসিআর-এর নথিবদ্ধ করা ৩৪টি পৃথক ঘটনার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সহিংসতার আঁচ সবচেয়ে বেশি লেগেছে কোচবিহার, উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা, কলকাতা, মুর্শিদাবাদ, হাওড়া, মালদা এবং বীরভূমে। রিপোর্টে অন্তত দুজনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছে। এর মধ্যে কোচবিহারের গোসাইনিমারিতে একটি মসজিদ রক্ষা করতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন এক মুসলিম ব্যক্তি।

রিপোর্ট অনুযায়ী, এই সহিংসতা ছিল অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট ও লক্ষ্যবস্তু-ভিত্তিক। এপিসিআর-এর অভিযোগ কোচবিহার, হাওড়া, বারাসাত ও মুর্শিদাবাদের বেশ কিছু মসজিদে ভাঙচুর চালানো হয়েছে। বিশেষ করে ‘জয় শ্রী রাম’ ধ্বনি সংবলিত মিছিল চলাকালীন উস্কানিমূলক হামলার অভিযোগ উঠেছে।

মুসলিম মালিকানাধীন হোটেল, মাংসের দোকান এবং গবাদি পশুর হাটগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে। বারাসাতে দুটি হোটেল গুঁড়িয়ে দেওয়া এবং কলকাতায় আমিষ খাবারের দোকান বন্ধ করতে বাধ্য করার মতো ঘটনা ঘটেছে। অন্তত ৫৪টি সম্পত্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং প্রায় ৫০ জন ব্যক্তি সরাসরি শারীরিক ও অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

এপিসিআর-এর রিপোর্টে এক নতুন ধরনের ভীতি প্রদর্শনের কথা উঠে এসেছে। অভিযোগ করা হয়েছে যে, বিজয় মিছিলে ‘বুলডোজার’ প্রদর্শন করে সংখ্যালঘুদের উচ্ছেদ বা দমনের হুমকি দেওয়া হয়েছে। এছাড়া মুসলিম ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন স্থানের নাম পরিবর্তনেরও চেষ্টা চলছে।

‘সানাউল্লাহ মঞ্চ’, ‘এন পাড়া মসজিদ বাড়ি রোড’ এবং ‘সিরাজউদ্দৌলা উদ্যান’-এর মতো নামগুলো মুছে ফেলার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। হাওড়ায় মুসলিম নারীদের হিজাব পরতে বাধা দেওয়া এবং কসাইখানা বন্ধের হুমকির মাধ্যমে ব্যক্তিগত স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের অভিযোগ করা হয়েছে।

সহিংসতা কেবল সাম্প্রদায়িক গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। নির্বাচনে পরাজিত তৃণমূল কংগ্রেসের কার্যালয় ও নেতাদের বাড়িও হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। বেশ কিছু জায়গায় তৃণমূলের দলীয় কার্যালয় দখল করে নেওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

সংস্থাটি দাবি করেছে, এই ভয়াবহ সহিংসতার অনেক খবরই মূলধারার গণমাধ্যমে সেভাবে আসেনি। তারা স্থানীয় সূত্র ও মাঠপর্যায়ের কর্মীদের মাধ্যমে এই তথ্য সংগ্রহ করেছে। এপিসিআর-এর মতে, এই ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন কোনো বিশৃঙ্খলা নয়, বরং এটি একটি সুসংগঠিত “বিদ্বেষপূর্ণ পরিবেশের” বহিঃপ্রকাশ।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের পর জয়ী ও বিজিত উভয় পক্ষের সংযম বজায় রাখা জরুরি ছিল, কিন্তু এই রিপোর্ট পশ্চিমবঙ্গের সামাজিক বুননে বড় ধরনের ফাটলের ইঙ্গিত দিচ্ছে।