ট্রাম্প-শি মেগা বৈঠক: বেইজিংয়ে শুরু হচ্ছে বিশ্ব রাজনীতির নতুন সমীকরণ

0
ট্রাম্প-শি মেগা বৈঠক: বেইজিংয়ে শুরু হচ্ছে বিশ্ব রাজনীতির নতুন সমীকরণ

আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ দীর্ঘ সাত বছরের প্রতীক্ষা আর বৈশ্বিক কূটনীতির টানাপড়েন শেষে অবশেষে চীনের মাটিতে পা রাখলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বুধবার (১৩ মে) বেইজিং পৌঁছানোর পর তাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানানো হয়। ২০১৭ সালের পর এটিই তার প্রথম চীন সফর। আগামীকাল বৃহস্পতিবার ও পরদিন শুক্রবার চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সাথে ট্রাম্পের এই ঐতিহাসিক বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।

বিশ্বের দুই শীর্ষ অর্থনৈতিক ও সামরিক পরাশক্তির এই বৈঠককে বর্তমান সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক ঘটনা হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।

দুই নেতার বৈঠকে যে বিষয়গুলো সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাবে:

বাণিজ্য যুদ্ধ ও শুল্ক নীতি: ট্রাম্পের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক ঘাটতি কমানো। বোয়িং বিমান, গরুর মাংস ও সয়াবিনের মতো মার্কিন পণ্য চীনকে আরও বেশি কিনতে উদ্বুদ্ধ করা এবং বিতর্কিত আমদানি শুল্কের সমাধান খোঁজা এই সফরের মূল এজেন্ডা।

ইরান সংকট ও জ্বালানি নিরাপত্তা: মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের অস্থিরতা বিরাজ করছে। ইরানের তেলের প্রধান আমদানিকারক হিসেবে চীনকে ব্যবহার করে তেহরানকে আলোচনার টেবিলে ফেরাতে চান ট্রাম্প।

সেমিকন্ডাক্টর ও বিরল খনিজ (Rare Earth): চিপ প্রযুক্তি নিয়ে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এবং পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে চীনের খনিজ রপ্তানি বন্ধের বিষয়টি বিশ্ব অর্থনীতিকে স্থবির করে দিয়েছে। দুই দেশই এখন এই সরবরাহ ব্যবস্থা সচল করতে চায়।

তাইওয়ান ও ভূ-আঞ্চলিক নিরাপত্তা: দক্ষিণ চীন সাগর ও তাইওয়ান প্রণালিতে ক্রমবর্ধমান সামরিক উত্তেজনা কমাতে দুই নেতার মধ্যে সরাসরি আলোচনা হবে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI): প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণ এবং এআই-এর ঝুঁকি মোকাবিলায় একটি বৈশ্বিক নীতিমালার প্রাথমিক খসড়া নিয়ে আলোচনার সম্ভাবনা রয়েছে।

লাইডেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সালভাদর সান্তিনো রেগিলমে বিষয়টিকে একটি ‘কূটনৈতিক বৈপরীত্য’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি বলেন “যুক্তরাষ্ট্র ও চীন এমন এক সম্পর্কের জালে আটকে আছে যেখানে একে অপরের প্রতি চরম অবিশ্বাস থাকা সত্ত্বেও অর্থনৈতিকভাবে তারা গভীর সংলগ্ন। কেউ কাউকে ছাড়া চলতে পারবে না, অথচ প্রত্যেকেই স্বাধীনভাবে শ্রেষ্ঠত্ব চায়।”

বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই সফরের পেছনে আসন্ন মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের একটি বড় ভূমিকা রয়েছে। ভোটারদের কাছে অর্থনৈতিক সাফল্য তুলে ধরতে বেইজিংয়ের কাছ থেকে একটি ‘বড় চুক্তি’ বাগিয়ে নিতে মরিয়া তিনি।

মার্কিন কৃষি ও প্রযুক্তি পণ্যের বাজার নিশ্চিত করা এবং ইরান ইস্যুতে চীনের প্রভাব খাটানো। এছাড়া হংকংয়ের মানবাধিকার কর্মী জিমি লাই-এর মুক্তি নিয়েও সরব হতে পারেন ট্রাম্প। উন্নত চিপ ও প্রযুক্তি সরঞ্জামের ওপর থেকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা এবং তাইওয়ানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপ কমানো।

ইরান যুদ্ধের উত্তাপ আর বাণিজ্য যুদ্ধের শীতল স্রোতের মাঝে এই বৈঠক কেবল দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উন্নয়ন নয়, বরং ভবিষ্যৎ বিশ্বব্যবস্থার নেতৃত্ব কার হাতে থাকবে—তারই একটি পথনকশা তৈরি করবে। সারা বিশ্বের নজর এখন বেইজিংয়ের ‘গ্রেট হল অব দ্য পিপল’-এর দিকে, যেখানে নির্ধারিত হবে আগামী কয়েক বছরের বৈশ্বিক অর্থনীতির গতিপথ।